
বিয়ের অনুষ্ঠান, পারিবারিক আয়োজন কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াত খেতে গেলে অনেকেই একটি বিষয় নিয়ে ভাবেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে বাড়ির মালিককে কিছু টাকা দেওয়া উচিত কি না।
কেউ মনে করেন, এতে আয়োজকের উপকার হয়। আবার অনেকে ভাবেন, দাওয়াত খাওয়ার পর টাকা দেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে বিয়ের দাওয়াত কিংবা বড় কোনো অনুষ্ঠানে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন অনেকে।
ইসলামে মেহমানদারি ও অতিথিকে সম্মান করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, কাউকে উপহার দেওয়া কিংবা আর্থিকভাবে সহযোগিতা করাও প্রশংসনীয় কাজ। তাই দাওয়াত খাওয়ার পর আয়োজককে স্বেচ্ছায় কিছু অর্থ দেওয়া নিজে থেকে নিষিদ্ধ নয়। তবে সেটি খাবারের মূল্য হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, নাকি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা থেকে উপহার হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, তা বিবেচনা করা জরুরি।
সাধারণ দাওয়াতের ক্ষেত্রে অতিথির কাছ থেকে খাবারের মূল্য নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে আগে থেকে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে পারস্পরিক সমঝোতা থাকলে সেটি ভিন্ন বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইসলামে অতিথিকে সম্মান করা এবং যথাসাধ্য আপ্যায়ন করাকে উত্তম গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬১৩৫)
অতিথি আপ্যায়নের বিষয়ে ইসলামের এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, মেহমানদারি মূলত সৌজন্য, ভালোবাসা ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ দাওয়াতকে খাবারের বিনিময়ে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয় না।
দাওয়াত খেয়ে আয়োজকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য কেউ স্বেচ্ছায় টাকা, উপহার কিংবা অন্য কোনো সহযোগিতা করতে চাইলে তা বৈধ। কারণ ইসলামে উপহার দেওয়া ও গ্রহণ করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) উপহার গ্রহণ করতেন এবং তার প্রতিদানও দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৫৮৫)
অর্থাৎ, দাওয়াত খেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে আয়োজককে কিছু অর্থ দেওয়া হলে এবং তা উপহার বা সহযোগিতা হিসেবে গ্রহণ করা হলে সেটি বৈধ হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়।
পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে তা বৈধ।’
আরও পড়ুনঃ সন্তানের জন্মদিনে দান-সদকা করলে কি সওয়াব হবে?
এই আয়াত থেকে পারস্পরিক সম্মতি ও অন্যের সম্পদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। তাই কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আগে যদি নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষের সম্মতি থাকে, তাহলে সেটি সাধারণ দাওয়াতের চেয়ে ভিন্ন বিষয়।
বিষয়টি আরও পরিষ্কার করতে কয়েকটি পরিস্থিতি বিবেচনা করা যেতে পারেঃ
১. নিজের ইচ্ছায় টাকা দিলে: দাওয়াত খেয়ে খুশি হয়ে আয়োজককে স্বেচ্ছায় অর্থ দিলে তা উপহার বা সহযোগিতা হিসেবে গণ্য হবে। এতে কোনো বাধা নেই।
২. আগে থেকেই অর্থ দেওয়ার শর্ত থাকলে: কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আগে যদি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি থাকে, তাহলে সেটি যৌথ খরচ বা সম্মতিভিত্তিক আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
৩. আয়োজক খাবারের মূল্য দাবি করলে: সাধারণ দাওয়াতের পর আগে থেকে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা না থাকলে অতিথির কাছে খাবারের মূল্য দাবি করার সুযোগ নেই। তবে আগে থেকে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি থাকলে বিষয়টি আলাদা।
৪. সামাজিক চাপে টাকা দিলে: লোকলজ্জা, সামাজিক চাপ কিংবা বাধ্যবাধকতার কারণে টাকা দেওয়া প্রকৃত অর্থে স্বেচ্ছায় উপহার দেওয়ার মতো নয়। উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিকতা ও স্বাধীন ইচ্ছা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামে উপহার ও সৌজন্য বিনিময় মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সম্প্রীতি এবং আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করে। তবে উপহার দেওয়ার নামে কাউকে আর্থিক চাপে ফেলা কিংবা সামাজিকভাবে বাধ্য করা উচিত নয়। দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের সম্মান ও স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখা জরুরি।
এ বিষয়ে হানাফি ফিকাহর আলোচনায় উপহার আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক সম্মতির গুরুত্ব রয়েছে। দারুল ইফতা বার্মিংহামের একটি ফতোয়ায় সাধারণ দাওয়াত ও বিয়ের দাওয়াতে অংশগ্রহণের বিধান আলোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, দারুল ইফতা জাম্বিয়ার একটি ফতোয়ায় খাবারের আয়োজন ও মাথাপিছু খরচের ক্ষেত্রে পূর্বসম্মতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে দাওয়াত খাওয়ার পর আয়োজককে স্বেচ্ছায় টাকা বা উপহার দেওয়া জায়েজ। তবে সাধারণ দাওয়াতের খাবারের বিনিময়ে অর্থ দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। আগে থেকে কোনো আর্থিক সমঝোতা না থাকলে অতিথির ওপর খাবারের মূল্য পরিশোধের দায়িত্বও বর্তায় না।
সুতরাং, দাওয়াত শেষে কাউকে খুশি হয়ে কিছু দেওয়া ভালোবাসা ও সৌজন্যের প্রকাশ হতে পারে। কিন্তু সেটিকে বাধ্যতামূলক নিয়মে পরিণত করা কিংবা অতিথির ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়।



