প্রবাসের চাকচিক্যের আড়ালে একাকিত্ব আর বিসর্জনের জীবন

প্রবাস মানেই কি অর্থ উপার্জন, উন্নত জীবন আর পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যৎ? বাইরে থেকে প্রবাসীদের জীবন যতটা স্বচ্ছল ও আনন্দময় মনে হয়, বাস্তবতা অনেক সময় তার সম্পূর্ণ বিপরীত। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে হাজার মাইল দূরে থাকা মানুষগুলোর জীবনে জমে থাকে অসংখ্য না-বলা কষ্ট, একাকিত্ব, দীর্ঘশ্বাস আর আত্মত্যাগের গল্প। তাঁদের পাঠানো অর্থের হিসাব সবাই রাখলেও সেই অর্থ উপার্জনের পেছনে লুকিয়ে থাকা শ্রম, ঘাম, অশ্রু আর বেদনার খবর খুব কম মানুষই রাখেন।
দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে পা রাখার সময় প্রতিটি প্রবাসীর বুকভরা স্বপ্ন থাকে। কারও স্বপ্ন বাবা-মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, কারও স্বপ্ন সন্তানের উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত করা, আবার কারও স্বপ্ন পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলা। এসব স্বপ্ন পূরণের আশায় তাঁরা ছেড়ে আসেন প্রিয়জন, পরিচিত পরিবেশ, শৈশবের স্মৃতি আর আপন ঠিকানা। এরপর শুরু হয় কঠোর পরিশ্রম, সীমাহীন দায়িত্ব এবং নিজের অসংখ্য ইচ্ছাকে বিসর্জন দেওয়ার এক দীর্ঘ জীবনসংগ্রাম।
প্রবাসজীবনের সবচেয়ে কষ্টের অধ্যায়গুলোর একটি হলো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে পরিবারের পাশে থাকতে না পারা। সন্তানের প্রথম স্কুলে যাওয়া, ঈদের আনন্দ, বাবা-মায়ের অসুস্থতা কিংবা পরিবারের কোনো বিশেষ আয়োজন—সবকিছুই দেখতে হয় মোবাইল ফোনের ছোট্ট পর্দায়। সন্তানের মুখে যখন প্রশ্ন আসে, ‘বাবা, তুমি কবে আসবে?’ তখন অনেক প্রবাসী বাবার কাছেই থাকে না কোনো সান্ত্বনাদায়ক উত্তর।
কারণ দেশে ফেরা মানেই অনেকের ক্ষেত্রে কর্মবিরতি, আয় কমে যাওয়া কিংবা চাকরি হারানোর আশঙ্কা। আর আয় বন্ধ হলে থমকে যেতে পারে পরিবারের স্বপ্ন, প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবাসীদের হাসিমুখের ছবি কিংবা দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণ দেখে অনেকেই তাঁদের জীবনকে সফল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় মনে করেন। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা খুব কম মানুষই উপলব্ধি করেন। বিদেশের মাটিতে অসুস্থ হলে নিজের যত্ন নিজেকেই নিতে হয়। মন খারাপের রাতে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো আপনজন পাশে থাকে না। উৎসব, আনন্দ কিংবা পারিবারিক দুঃসময়ে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে না পারার বেদনাও নীরবে বয়ে বেড়াতে হয় তাঁদের।
প্রবাসজীবনের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো—সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। দেশে অপেক্ষায় থাকা বৃদ্ধ বাবা-মা একসময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে পারেন। সন্তানের শৈশব পেরিয়ে যায়, সে বড় হয়ে ওঠে নিজের মতো করে। অথচ পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে বিদেশের মাটিতে ব্যস্ত মানুষটি অনেক সময় বুঝতেই পারেন না, জীবনের কত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তাঁর অজান্তেই হারিয়ে যাচ্ছে।
একসময় হয়তো অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আসে। পরিবারের অভাব দূর হয়, স্বপ্নের বাড়ি তৈরি হয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎও সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই সাফল্যের পথে হারিয়ে যাওয়া সময় আর ফিরে আসে না। ফিরে পাওয়া যায় না সন্তানের শৈশব, ফিরে পাওয়া যায় না হারিয়ে যাওয়া বাবা-মাকে, ফিরে আসে না একসঙ্গে কাটানো আনন্দের মুহূর্তগুলো।
তখন হয়তো অনেক কিছুই থাকে, শুধু থাকে না জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষগুলোর সঙ্গে কাটানো সেই অমূল্য সময়।
অর্থ জীবনের অনেক প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো সময় কিংবা দুঃসময়ে পাশে থাকার অনুভূতি কখনো কিনে দিতে পারে না। তারপরও প্রবাসীরা থেমে থাকেন না। কারণ তাঁদের কাঁধে থাকে পরিবারের দায়িত্ব, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, বাবা-মায়ের প্রত্যাশা এবং আপনজনদের মুখে হাসি ফোটানোর অঙ্গীকার।
তাই প্রবাসীদের শুধু অর্থ পাঠানোর মানুষ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁদেরও অনুভূতি আছে, অভিমান আছে, ক্লান্তি আছে, ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে। তাঁরাও চান কেউ তাঁদের মনের খবর নিক, কাজের ব্যস্ততার বাইরে একটু সময় নিয়ে কথা বলুক। পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে খোঁজ নেওয়া কিংবা শুধু ‘কেমন আছো?’—এই একটি প্রশ্নও তাঁদের কাছে বড় মানসিক সান্ত্বনা হয়ে উঠতে পারে।
প্রবাসে থাকা মানুষটির কাছে পরিবারের ভালোবাসা ও মানসিক সমর্থন অনেক বড় শক্তি। তাই তাঁদের পাঠানো অর্থের পাশাপাশি তাঁদের শ্রম, ত্যাগ ও অনুভূতির মূল্যায়ন করাও জরুরি। পরিবারের উচিত তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, তাঁদের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা এবং দূরত্বের মধ্যেও ভালোবাসার বন্ধন অটুট রাখা।
মনে রাখতে হবে, প্রবাসীরা শুধু অর্থ উপার্জন করেন না; তাঁরা পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেদের বর্তমানকে বিসর্জন দেন। তাঁদের পাঠানো প্রতিটি টাকার পেছনে লুকিয়ে থাকে কঠোর পরিশ্রম, ঘাম, অশ্রু এবং আপনজনদের কাছ থেকে দূরে থাকার এক দীর্ঘ বেদনার ইতিহাস।
প্রবাসীর সাফল্য শুধু তাঁর পাঠানো টাকার অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিবারের জন্য তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, ত্যাগ ও বিসর্জনের মধ্যেই সেই সাফল্যের প্রকৃত মূল্য নিহিত।
তাঁদের অবদানকে যথাযথ সম্মান জানানোই হোক আমাদের মানবিক দায়িত্ব।
লেখা: আল মামুন শিপন



