বিশ্ববাজারে এ বছর পণ্যমূল্য বাড়তে পারে ২৩ শতাংশ

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রভাবে চলতি বছর বিশ্ববাজারে পণ্যের সামগ্রিক দাম গত বছরের তুলনায় গড়ে ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে ৩২ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ। আগামী বছর সামগ্রিক পণ্যমূল্য কমার পূর্বাভাস থাকলেও খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ‘অক্টোবর ২০২৬: কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে এসব পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চলতি বছর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৫ সালে এই দাম ছিল ৬৯ ডলার। তবে ২০২৭ সালে তেলের গড় দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলারে নেমে আসতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে তেলের মজুত কমে গেছে। নতুন করে সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিলে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবেও জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনে বাধা এবং রাশিয়ার পরিশোধিত জ্বালানি তেলের উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় বাজারের অস্থিরতা আরও বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে দাম বাড়তে পারে আরও ৭ শতাংশ। অর্থাৎ দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ তৈরির পেছনে কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্যশস্য রপ্তানিতে বিঘ্ন, এল নিনোর প্রভাবে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের দাম ১৪ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৭ সালে এ দাম আরও ৯ শতাংশ বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হলে, কৃষ্ণসাগর দিয়ে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং এল নিনোর প্রভাব আশঙ্কার চেয়ে বেশি হলে খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ আরও বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর্যায় ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাও আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি ধাতু ও খনিজের দামও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে ধাতু ও খনিজের গড় দাম গত বছরের তুলনায় ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং তথ্যকেন্দ্র খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে সরবরাহের সীমাবদ্ধতাও এসব ধাতুর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ বছর মূল্যবান ধাতুর দামও প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে।
তবে ২০২৭ সালে বিশ্ববাজারে সামগ্রিক পণ্যমূল্য সূচক ৭ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির এই পূর্বাভাস নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বড় পরিসরে ছড়িয়ে না পড়া, রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে পণ্য রপ্তানির বাধা কমে আসা এবং এল নিনোর প্রভাবে ফসলের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে থাকা।
তবে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, এমন পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর্যায় ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আরও প্রকট হতে পারে।
পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তার বিষয়েও প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলেছে, বিদ্যমান অর্থায়ন ব্যবস্থার আওতায় এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে তাদের। এর মধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পরিকল্পনা ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাত থেকে পুঁজি সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।



