
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসন সংকট এবং সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে ইউরোপের চার দেশে রাজপথে নেমেছেন লাখো মানুষ। শনিবার ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে বিক্ষোভ হয়। কয়েকটি শহরে এসব কর্মসূচি সহিংস রূপ নেয়। কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, কোথাও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।
বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের প্যারিস, মার্সেই, নিস, নঁত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক ডজন দোকান লুট করা হয়েছে। দেশটিতে স্কুলের পরিবেশ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে আনুমানিক ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।
রাজধানী প্যারিসে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।
এদিকে, বিক্ষোভকারীরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠার পর ফ্রান্সের ১৪৩ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে স্থাপনাটির ছাদ ভেঙে নিচের তলায় পড়ে যেতে দেখা যায়।
লিমোজ শহরের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে সেখানকার টাউন হলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়েছে। তাঁরা এই ক্ষয়ক্ষতিকে ঐতিহ্যের জন্য ‘বিপর্যয়’ বলে বর্ণনা করেছেন।
বিক্ষোভের ঘটনায় ফ্রান্সে অন্তত ১৯৫ জনকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিক্ষোভ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে।
গত মাসে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ফ্রান্সে এই বিক্ষোভের সূচনা হয়। পরে তা আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে। স্কুলের অবনতিশীল পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে পুলিশের অভিযানে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের চোয়াল ভেঙে যায়। এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সের আলঁসোঁ শহরে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে এক কিশোরীকে হেডলক দিয়ে আটকে রাখতে দেখা যায়। আইন অনুযায়ী, এ ধরনের কৌশল নিষিদ্ধ।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের আড়ালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পুলিশ প্রশাসনের কার্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও টাউন হলে হামলা এবং লুটপাট চালানো ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
ফ্রান্সের বাইরে বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী ব্রাসেলসে পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছোড়া ও আগুন জ্বালানোর অভিযোগে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। লিয়েজ শহরেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান মোতায়েন করে পুলিশ।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং বড় শহরগুলোতে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে মিছিল করেন কয়েক দশ হাজার মানুষ। দেশটিতে ২০১৭ সালের পর থেকে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন চুক্তিতে বাসাভাড়াও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুক্রবার পর্তুগালের সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম বলেন, ‘রাস্তায় চিৎকারের কাছে সরকার নতি স্বীকার করবে না।’ অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতারা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও দৈনন্দিন সমস্যার সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলেছেন।
ইতালির মিলান ও বোলোনিয়া শহরেও বিক্ষোভকারীদের পাথর নিক্ষেপ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর জানিয়েছে পুলিশ। তবে একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন স্থানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও পালিত হয়েছে।
ইউরোপের চার দেশে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি, আবাসন ও সরকারি সেবার মান নিয়ে জনঅসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এসব কর্মসূচি দেখা হচ্ছে।



