
বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এই খরচ অনেক বেশি। বিদেশি ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সেবামূল্য বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর বিভিন্ন ধরনের ফি ও কর আরোপ এবং বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠাতে গড়ে খরচ হয়েছে ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে এই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮২ শতাংশে। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় খরচ বেড়েছে শূন্য দশমিক ০৪ শতাংশ।
প্রতিবেদনের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে ১ হাজার ডলার রেমিট্যান্স পাঠাতে গড়ে খরচ হয়েছে ১৭ দশমিক ৮০ ডলার। এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে একই পরিমাণ অর্থ পাঠাতে খরচ হয়েছে ১৮ দশমিক ২০ ডলার। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে ১ হাজার ডলার রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেড়েছে ৪০ সেন্ট।
রেমিট্যান্স পাঠানোর অঙ্ক অনুযায়ীও খরচে পার্থক্য রয়েছে। ২০০ ডলার পর্যন্ত রেমিট্যান্স পাঠাতে জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে খরচ হয়েছে ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৯৪ শতাংশে। ২০০ থেকে ৫০০ ডলার পর্যন্ত রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে একই সময়ে খরচ সামান্য কমেছে। এ ক্ষেত্রে খরচ শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ হয়েছে।
অন্যদিকে, ৫০০ ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে খরচ সামান্য বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে এ খরচ ছিল শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা এপ্রিল থেকে জুনে বেড়ে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে ছোট অঙ্কের রেমিট্যান্স পাঠাতে খরচ বেশি, আর বড় অঙ্কের অর্থ পাঠালে খরচের হার কম।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, বেশির ভাগ দেশ থেকেই ২০০ ডলার পর্যন্ত রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেড়েছে। তবে কয়েকটি দেশ থেকে এ খরচ কমেছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুর। আর খরচ বেড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, ইতালি, ওমান ও যুক্তরাজ্য থেকে।
দেশভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় খরচ ছিল ২ দশমিক ৫২ শতাংশ। এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে তা কমে ২ দশমিক ২৭ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৯২ শতাংশ হয়েছে।
মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ ১ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ১২ শতাংশ হয়েছে। কাতার থেকে খরচ ১ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ২৮ শতাংশে উঠেছে। ইতালি থেকে ১ দশমিক ১৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ। ওমান থেকে খরচ ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ হয়েছে। আর যুক্তরাজ্য থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ ১ দশমিক ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, কুয়েত থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকের ১ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে কমে এপ্রিল থেকে জুনে ১ দশমিক ৫১ শতাংশ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এ খরচ ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ১১ শতাংশে নেমেছে।
সবচেয়ে বেশি কমেছে সিঙ্গাপুর থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ। জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে সিঙ্গাপুর থেকে রেমিট্যান্স পাঠাতে গড়ে খরচ হয়েছে ১ দশমিক ৩১ শতাংশ। এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে তা কমে শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ হয়েছে। এর বাইরে আরও অনেক দেশ থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আসে। এসব দেশের বেশির ভাগ থেকেই রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেড়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বাড়লে প্রবাসীদের মধ্যে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়তে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে আগেভাগেই সতর্ক হতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা যেতে পারে।
তাঁরা আরও বলছেন, বিদেশে প্রবাসীদের ব্যাংকিং সুবিধা এখনো সীমিত। এ সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি সেখানে দেশি ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ হাউজের কার্যক্রম বাড়ানো গেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ কমানো সম্ভব হতে পারে।
এদিকে দেশের ভেতরে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের স্বজনদের কাছে রেমিট্যান্সের অর্থ পৌঁছানোর খরচ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ কিছুটা কমেছে।



