পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোন কোন দেশে মিলবে না কাজের ভিসা?
বিদেশে কাজের জন্য ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের ভিসা নিতে গেলে অনেক সময় পাসপোর্ট, মেডিকেল রিপোর্ট, চাকরির চুক্তিপত্র ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের পাশাপাশি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট (PCC) জমা দিতে হয়।
তবে সব দেশের ক্ষেত্রে এ নিয়ম এক নয়। কোনো দেশে নির্দিষ্ট পেশার কর্মীদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক, আবার কোনো দেশে আবেদনকারীর জাতীয়তা, বসবাসের ইতিহাস কিংবা নিয়োগকর্তার শর্ত অনুযায়ী পুলিশ ক্লিয়ারেন্স চাওয়া হয়।
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য প্রকাশিত সরকারি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য পর্যালোচনায় কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে এ সনদের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি পাওয়া গেছে।
বাহরাইনে কাজের ভিসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ রয়েছে। বাহরাইনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রকাশিত প্রি-ভিসা অ্যাটেস্টেশনসংক্রান্ত কাগজপত্রের তালিকায় ওয়ার্ক ভিসার জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের কথা বলা হয়েছে। সনদটি বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে নিয়োগকর্তা, পেশা ও ভিসার ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্রের প্রয়োজন হতে পারে।
সৌদি আরবের কিছু কর্মভিসা-সংক্রান্ত নথির তালিকায় পুলিশ রিপোর্ট বা অপরাধসংক্রান্ত ছাড়পত্রের উল্লেখ রয়েছে। সৌদি আরবের একটি সরকারি দূতাবাসের প্রকাশিত ওয়ার্ক ভিসার নির্দেশনায় সাম্প্রতিক পুলিশ রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে এটি সব দেশের আবেদনকারীর জন্য একইভাবে প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত নয়। বাংলাদেশ থেকে আবেদন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সৌদি দূতাবাস, অনুমোদিত ভিসা সেন্টার বা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে আগে থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা জেনে নেওয়া উচিত।
যুক্তরাজ্যে সব ধরনের কর্মভিসার জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বাধ্যতামূলক নয়। তবে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সেবাসংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট কিছু পেশায় Skilled Worker ভিসার আবেদনকারীদের অপরাধসংক্রান্ত সনদ জমা দিতে হয়।
যুক্তরাজ্য সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, এ শর্তের আওতায় থাকা আবেদনকারীকে গত ১০ বছরে ১৮ বছর বয়সের পর যেসব দেশে একটানা বা মোট ১২ মাস বা তার বেশি সময় বসবাস করেছেন, সেসব দেশের পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অপরাধসংক্রান্ত সনদ দিতে হতে পারে। যুক্তরাজ্যের বাইরে বসবাসের সময়ের জন্য এ নিয়ম প্রযোজ্য।
অস্ট্রেলিয়ার কর্মভিসাসহ বিভিন্ন ভিসার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর চরিত্র বা অপরাধসংক্রান্ত ইতিহাস যাচাই করা হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনে আবেদনকারীর কাছে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বা Penal Clearance Certificate চাইতে পারে।
সাধারণত গত ১০ বছরে ১৬ বছর বয়সের পর যেসব দেশে ১২ মাস বা তার বেশি সময় বসবাস করেছেন, সেসব দেশের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স চাওয়া হতে পারে। তবে আবেদনকারীর ভিসার ধরন ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী শর্ত ভিন্ন হতে পারে।
কানাডায় ওয়ার্ক পারমিটের ক্ষেত্রে সব আবেদনকারীর জন্য শুরুতেই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আবেদন যাচাইয়ের সময় নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের পুলিশ সার্টিফিকেট চাইতে পারে।
কানাডার International Experience Canada কর্মসূচির ক্ষেত্রে সাধারণত ১৮ বছর বয়সের পর কোনো দেশে একটানা ছয় মাস বা তার বেশি সময় অবস্থান করলে সেই দেশের পুলিশ সার্টিফিকেট দিতে হয়। অন্যান্য ওয়ার্ক পারমিটের ক্ষেত্রেও আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত নথি চাওয়া হতে পারে।
আরও পড়ুণঃ বিদেশে যাওয়ার আগে মেডিকেলে আনফিট হতে পারেন যেসব কারণে!
ইউএইতে নতুন কর্মভিসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের জন্য Good Conduct Certificate বা পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
রাস আল খাইমাহ ইকোনমিক জোনের (RAKEZ) প্রকাশিত ২০২৬ সালের তালিকায় আফগানিস্তান, আলজেরিয়া, ভুটান, মিসর, ইরাক, নেপাল, নাইজেরিয়া, শ্রীলঙ্কাসহ কয়েকটি দেশের নাম রয়েছে।
তবে ওই প্রকাশিত তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। ফলে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ইউএইর সব কর্মভিসায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বাধ্যতামূলক—এমন দাবি করার মতো নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। ভিসার আবেদন করার আগে নিয়োগকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সর্বশেষ শর্ত নিশ্চিত করা জরুরি।
কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বসবাসরত বিদেশিদের চাকরিসংক্রান্ত প্রয়োজনে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে হলে নিজ দেশের দূতাবাস থেকে দেওয়া সনদ সত্যায়িত করে জমা দিতে হতে পারে।
তবে এটি বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মভিসায় যাওয়ার আগে প্রত্যেক আবেদনকারীর জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বাধ্যতামূলক এমন নয়।
অন্যদিকে, ওমানের রয়্যাল ওমান পুলিশের প্রকাশিত সাধারণ ওয়ার্ক ভিসার কাগজপত্রের তালিকায় পাসপোর্ট, কাজের অনুমতিপত্র ও মেডিকেল পরীক্ষার কথা রয়েছে।
সেখানে সাধারণ কর্মভিসার জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্সকে বাধ্যতামূলক নথি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে নির্দিষ্ট পেশা বা নিয়োগকর্তার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্ত থাকতে পারে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের অনলাইন পোর্টালে আবেদন করতে হয়। আবেদনকারীর পাসপোর্ট, ঠিকানা ও প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে হয়। আবেদন যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট জেলা বা মহানগর পুলিশ কর্তৃপক্ষ সনদ ইস্যু করে।
আবেদনের আগে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—
১. পাসপোর্টের তথ্য ও বর্তমান ঠিকানা সঠিকভাবে দিতে হবে।
২. গন্তব্য দেশের চাহিদা অনুযায়ী সনদটি ইংরেজিতে সংগ্রহ করতে হবে।
৩. প্রয়োজন হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাস থেকে সত্যায়ন করাতে হবে।
৪. সনদের মেয়াদ বা গ্রহণযোগ্যতার সময়সীমা নিয়োগকর্তা ও ভিসা কর্তৃপক্ষের কাছে জেনে নিতে হবে।
৫. আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের সর্বশেষ ভিসা নির্দেশনা যাচাই করতে হবে।

বাংলাদেশ পুলিশের অনলাইন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পোর্টাল: https://pcc.police.gov.bd
বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় অনেক কর্মী পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট ও বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্রকে একই বিষয় মনে করেন। বাস্তবে দুটি আলাদা প্রক্রিয়া।
পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের মাধ্যমে আবেদনকারীর অপরাধসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হয়। অন্যদিকে, বিএমইটির ছাড়পত্র বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রার আগে অভিবাসনসংক্রান্ত প্রক্রিয়ার অংশ।
তাই একটি সনদ থাকলেই অন্যটির প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায় না।
বিদেশে কর্মভিসা নিয়ে যাওয়ার আগে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স লাগবে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। বিশেষ করে বাহরাইন, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউএইর ক্ষেত্রে ভিসার ধরন এবং আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী শর্ত আলাদা হতে পারে।
দালাল বা অনানুষ্ঠানিক সূত্রের ওপর নির্ভর না করে নিয়োগকর্তা, সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও সরকারি অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা জেনে নেওয়াই নিরাপদ।




একটি মন্তব্য