প্রবাস

প্রবাসে স্বজন হারালে আর্থিক সহায়তা দেবে সরকার

মরদেহ আনতেও লাগবে না খরচ!

উন্নত জীবন,পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর প্রত্যাশা আর প্রিয়জনদের একটু ভালো রাখার আশায় প্রতিবছরই হাজার হাজার বাংলাদেশি পাড়ি জমান প্রবাসে।

কেউ যান মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে, কেউ ইউরোপের কোনো দেশে, আবার কেউ জীবিকার সন্ধানে পাড়ি দেন বিশ্বের অন্য প্রান্তে। বুকভরা স্বপ্ন আর পরিবারের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে দেশ ছাড়েন তাঁরা।

কিন্তু সবার স্বপ্নের শেষটা হয় না সুখের। কারও কারও জীবনের গল্প থেমে যায় বিদেশের মাটিতেই। যে মানুষটি পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন, একসময় তাঁকেই ফিরতে হয় নিথর দেহে, কফিনবন্দি হয়ে।

বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি কর্মীদের এমন করুণ পরিণতির পেছনে রয়েছে নানা কারণ। সড়ক দুর্ঘটনা, হৃদরোগ, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে প্রাণ হারান প্রবাসীরা। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও অসংখ্য বাংলাদেশি প্রবাসী মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁদের চলে যাওয়ায় একদিকে যেমন থেমে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, অন্যদিকে নেমে আসে আপনজন হারানোর গভীর শোক।

প্রবাসে উপার্জন করা মানুষটির মৃত্যুসংবাদ যখন দেশে পৌঁছায়, তখন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে একটি পরিবার। যে মানুষটির পাঠানো টাকায় চলত সংসার, পূরণ হতো সন্তানের পড়াশোনার খরচ কিংবা বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসা, তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিবারটির ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ে অনিশ্চিত।

এর মধ্যেই শুরু হয় আরেক দুশ্চিন্তা—কীভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে প্রিয়জনের মরদেহ? কোথা থেকে আসবে পরিবহন ও দাফনের টাকা? কীভাবে সংগ্রহ করতে হবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র? বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও কঠিন।

তবে শোকের এই কঠিন সময়ে প্রবাসী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের রয়েছে বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা। অনেকেই হয়তো জানেন না, বৈধভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া কোনো বাংলাদেশি কর্মী প্রবাসে মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুণঃ তিন মাস পর সৌদি আরব থেকে ফিরল আগুনে নিহত নওগাঁর পাঁচজনের মরদেহ

শুধু তাই নয়, নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরিবার পেতে পারে আর্থিক অনুদান এবং বিদেশে মৃত কর্মীর বকেয়া পাওনা ও ক্ষতিপূরণ আদায়েও সরকারি সহযোগিতা।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনও মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে।

বিদেশে কোনো প্রবাসী কর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নিয়োগকর্তা মরদেহ পরিবহনের খরচ বহন করতে অস্বীকৃতি জানালে এবং পরিবারের সেই খরচ বহনের সামর্থ্য না থাকলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল থেকে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়।

মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে তা গ্রহণের সময় পরিবারকে পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে এই অর্থ প্রদান করা হয়। এজন্য মরদেহ গ্রহণ করতে আসা স্বজনদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখতে হয়।

এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র, পরিবারের সদস্য সনদ এবং মরদেহ পরিবহন ও দাফন খরচের অর্থ গ্রহণের জন্য ক্ষমতা অর্পণপত্র।

২০১৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে বিদেশে মারা যাওয়া বৈধভাবে বিদেশগামী কর্মীর পরিবারকে ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

নির্ধারিত নিয়মে আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর এই অর্থ দেওয়া হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, আবেদন নিষ্পত্তি ও অর্থ পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাস সময়সীমার কথা উল্লেখ রয়েছে।

অনুদান পেতে মৃত কর্মীর পরিবারের সদস্যদের নিজ জেলার জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস অথবা ঢাকায় অবস্থিত ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কার্যালয়ে আবেদন করতে হবে।

কীভাবে আবেদন করবেন
কীভাবে আবেদন করবেন

আবেদন করার সময় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি জমা দিতে হয়। সেগুলো হলো—

১. ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরের কাছ থেকে দাপ্তরিক প্যাডে নেওয়া পরিবারের সদস্য সনদ। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা সিটি করপোরেশন এলাকার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে এটি সত্যায়িত করতে হবে।

২. ৪০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে দায়মুক্তি সনদ, অঙ্গীকারনামা ও ক্ষমতা অর্পণপত্র। সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধির স্বাক্ষরের পাশাপাশি নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের সত্যায়ন থাকতে হবে।

৩. মৃত প্রবাসীর পাসপোর্টের ফটোকপি, বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রত্যয়নপত্র এবং মৃত্যু সনদের সত্যায়িত ফটোকপি।

৪. যিনি অনুদানের টাকা গ্রহণ করবেন, তাঁর ব্যাংক হিসাবের তথ্যসংবলিত ব্যাংক প্রত্যয়নপত্র ও মূল ব্যাংক স্টেটমেন্ট। মৃত ব্যক্তির নাবালক সন্তান থাকলে তার নামে খোলা ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও প্রত্যয়নপত্রও প্রয়োজন হতে পারে।

৫. পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জনপ্রতিনিধি কর্তৃক সত্যায়িত এক কপি ছবি এবং জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক কর্তৃক সত্যায়িত এক কপি রঙিন ছবি।

এসব কাগজপত্রের নির্ধারিত নমুনা ফরম ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা যায়।

বিদেশে কোনো বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হলে শুধু মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা কিংবা আর্থিক অনুদান দেওয়ার মধ্যেই সরকারের সহায়তা সীমাবদ্ধ নয়।

মৃত কর্মীর নিয়োগকর্তা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কাছ থেকে মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্যোগ নেয় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড।

এ ছাড়া মৃত কর্মীর বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিট, বিমা সুবিধা কিংবা অন্য কোনো পাওনা থাকলে সেগুলো আদায়ের জন্যও সহযোগিতা করা হয়।

এসব সুবিধা পেতে পরিবারের সদস্যদের নির্ধারিত নিয়মে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও শ্রম উইংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

কোথায় এবং কীভাবে আবেদন করবেন?

বিদেশে কোনো প্রবাসী কর্মীর মৃত্যু হলে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। দূতাবাস মৃত্যুর বিষয়টি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায় এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে।

মরদেহ দেশে আনা এবং আর্থিক অনুদানের জন্য পরিবারের সদস্যরা নিজ জেলার জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। চাইলে সরাসরি ঢাকার ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডেও আবেদন জমা দেওয়া যায়।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ঠিকানা:

প্রবাসী কল্যাণ ভবন, পুরাতন এলিফ্যান্ট রোড, ইস্কাটন গার্ডেন, ঢাকা।

অভিযোগ বা সহযোগিতা পেতে কোথায় যোগাযোগ করবেন?

প্রবাসী কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সমস্যা সমাধানে ২০১৬ সাল থেকে ডিজিটাল হেল্প ডেস্ক চালু রেখেছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড।

সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই সেবা চালু থাকে। হেল্প ডেস্কে যোগাযোগ করে আবেদন, মরদেহ দেশে আনা কিংবা আর্থিক সহায়তা সংক্রান্ত সমস্যার কথা জানানো যায়।

জরুরি যোগাযোগ

  • টোল-ফ্রি নম্বর (দেশ থেকে): ১৬১৩৫
  • নম্বর (বিদেশ থেকে): +৮৮০ ৯৬১০১০২০৩০

অভিযোগ ও সমস্যা সংশ্লিষ্ট শাখা, মন্ত্রণালয়, সরকারি দপ্তর এবং বিদেশে অবস্থিত শ্রম উইংয়ে পাঠানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।

বোর্ডের ওয়েবসাইটে হেল্প ডেস্ক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগাযোগের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় ফরম পাওয়া যায়।

তাই বিদেশে কোনো বৈধ প্রবাসী কর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে আর্থিক সহায়তার বিষয়টি না জেনে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করলে মরদেহ পরিবহন ও দাফনের অর্থ, ৩ লাখ টাকার আর্থিক অনুদান এবং বিদেশে কর্মীর বকেয়া পাওনা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

 

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button