
একদিন এই বাড়িগুলোতেই ছিল স্বপ্নের গল্প। ছিল প্রিয় মানুষটির ফোনকলের অপেক্ষা, ছিল বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় সংসারের অভাব ঘোচানোর আশা।
কেউ মাকে বলেছিলেন, কয়েক বছর পর দেশে ফিরে আর কষ্ট করতে দেবেন না। কেউ স্ত্রীকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেবেন। আবার কেউ বাবার কাঁধের বোঝা নামানোর স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন সদুর সৌদি আরবে।
কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো আর পূরণ হলো না। সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিল ৭ বাংলাদেশির প্রাণ।
দীর্ঘ প্রায় পৌনে তিন মাসের অপেক্ষা, ডিএনএ পরীক্ষা ও পরিচয় শনাক্তের জটিলতা শেষে অবশেষে তাদের নিথর দেহ ফিরেছে দেশে।
গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) নিজ নিজ গ্রামের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন তারা। শেষ হয়েছে পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা, কিন্তু শেষ হয়নি কান্না। বরং প্রিয়জনকে চিরতরে হারানোর বেদনা এখন আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
যে পথে একদিন স্বজনেরা হাসিমুখে তাদের বিদায় দিয়েছিলেন, সেই পথেই এবার ফিরেছে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স। বাড়ির সামনে অ্যাম্বুলেন্স থামতেই ছুটে এসেছেন স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা।
কেউ কফিন জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন, কেউ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই, শুধু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে অশ্রু।
নওগাঁর ৫ জন এবং নাটোরের ২ জন—এই ৭ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে থেমে গেছে ৭ টি পরিবারের স্বপ্নের গল্প। শনিবার জানাজা শেষে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
এখন গ্রামের বাড়িগুলোতে বিরাজ করছে এক অদ্ভুত নীরবতা। যে ঘরে একসময় প্রবাসীর ফোন আসার অপেক্ষায় সবাই থাকতেন, সেই ঘরেই এখন পড়ে আছে স্মৃতি আর শূন্যতা।
নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার নিহত শাহিনের মা নার্গিস বেগমের বুকভাঙা আর্তনাদ যেন সাতটি পরিবারেরই গল্প। ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
আশা ছিল, ছেলে বিদেশে কাজ করে সংসারের অভাব দূর করবে, একদিন ঋণের বোঝাও নামবে।
কিন্তু সেই ছেলে আর মায়ের কোলে ফিরল না। ফিরল নিথর দেহ হয়ে।
আরও পড়ুনঃ প্রবাসে স্বজন হারালে আর্থিক সহায়তা দেবে সরকার
শাহিন রেখে গেছেন ছোট ছোট দুটি সন্তান। তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, কীভাবে ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন—এসব প্রশ্নে দিশেহারা মা নার্গিস বেগম। তাঁর প্রশ্ন, এত টাকা ঋণ কীভাবে শোধ করবেন, আর বাবাহারা শিশু দুটিই বা কী খাবে?
একজন মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যু যে কত বড় শূন্যতা, তা হয়তো কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যে ছেলেকে ঘিরে ছিল বৃদ্ধ বয়সের ভরসা, সেই ছেলের কবরের সামনে এখন শুধু কান্না আর অসহায়ত্ব।
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিকও গিয়েছিলেন পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে। বিদেশে কাজ পাওয়ার পর মাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, কারখানায় কাজ পেয়েছেন। বলেছিলেন, দুই বছর পর বাড়ি ফিরবেন।
মায়ের মনে হয়তো সেই কথাটিই বারবার ফিরে আসছিল। ছেলে ফিরবে, বাড়িতে আনন্দ হবে, আবার আগের মতো মায়ের পাশে বসে গল্প করবে। কিন্তু সেই অপেক্ষার পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ।
মিনহাজের মা পারুল বিবি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছেন, ছেলে বলেছিল, ‘আম্মু, কারখানায় কাজ পেয়েছি। দুই বছর পর বাড়ি আসব।’ আজ ছেলে বাড়ি ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু জীবিত নয়, ফিরছে লাশ হইয়া।
ছেলেকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন বাবা মজনু সরদারও। জীবনের শেষ বয়সে ছেলের হাত ধরে একটু সুখের দিন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে নিজের হাতেই ছেলের কফিন নামাতে হয়েছে তাঁকে।একজন বাবার জীবনে এর চেয়ে কঠিন মুহূর্ত আর কী হতে পারে!
আত্রাই উপজেলার সাধনগর গ্রামের সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুনের জীবনেও নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার। স্বামীকে বিদেশে পাঠানোর জন্য সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন তিনি।
ভেবেছিলেন, স্বামী বিদেশে কাজ করে টাকা পাঠাবেন, ঋণ পরিশোধ হবে, সংসারে ফিরবে সচ্ছলতা।কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তব হলো না।
এখন ঘরে ২ টি অবুঝ সন্তান। তাদের মাথার ওপর বাবার ছায়া নেই। অন্যদিকে ঋণের বোঝাও রয়ে গেছে আগের মতোই। পারভীন খাতুনের ভাষায়, ঋণের এক টাকাও শোধ হয়নি। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন, কীভাবে তাদের বড় করবেন—সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।
একদিকে স্বামী হারানোর শোক, অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মহা দুশ্চিন্তা। যে মানুষটির সঙ্গে জীবন কাটানোর কথা ছিল, তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এখন একাই জীবনের কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি পারভীন।
নিহত ৭ জনের মধ্যে ছিলেন নওগাঁর পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব ও সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।
অন্যদিকে নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শামীম ও খাজুরা গ্রামের সাব্বির হোসেনও চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন নিজ গ্রামের মাটিতে।
তাঁদের প্রত্যেকের জীবনেই ছিল আলাদা গল্প, আলাদা স্বপ্ন, আলাদা দায়িত্ব। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সব গল্পের পরিণতি করে দিয়েছে একই রকম।
গত ৯ আগস্ট রিয়াদের ওই সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে প্রাণ হারান ১৬ বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি নওগাঁয়। প্রথম দফায় ২৭ আগস্ট ৭ জনের মরদেহ দেশে আনা হয়।
বাকি ৭ জনের মরদেহ পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তে জটিলতা তৈরি হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার পর তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। অবশেষে শনিবার দেশে ফেরে তাদের মরদেহ।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য আপাতত পরিবারপ্রতি ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ৩ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনা খরচে মরদেহগুলো নিহতদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি জেলা প্রশাসনের সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
৭ জনের জানাজা শেষ হয়েছে, দাফনও সম্পন্ন হয়েছে। গ্রামের কবরস্থানে পাশাপাশি কিংবা নিজ নিজ স্থানে শুয়ে আছেন তাঁরা। কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া মানুষগুলোর জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কি কোনো অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব?
যে মা প্রতিদিন ছেলের ফোনের অপেক্ষায় থাকতেন, তিনি হয়তো এখনো ফোনের শব্দ শুনলে চমকে উঠবেন। যে স্ত্রী স্বামীর পাঠানো টাকায় সংসার চালানোর স্বপ্ন দেখতেন, তাঁকে এখন একাই সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে হবে।
যে শিশুরা বাবার হাত ধরে হাঁটতে শিখেছিল, তারা হয়তো একদিন বুঝবে—তাদের বাবা আর কখনো বাড়ি ফিরবেন না।
প্রবাসীরা শুধু বিদেশে কাজ করতে যান না, তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে যান পরিবারের হাজারো স্বপ্ন, আশা ও দায়িত্ব। তাঁদের উপার্জনে চলে সংসার, পড়াশোনা করে সন্তান, চিকিৎসা পান মা-বাবা।
অথচ কখনো কখনো সেই প্রবাসীরাই বিদেশের মাটিতে প্রাণ হারান, আর দেশে ফিরে আসে শুধু তাঁদের নিথর দেহ।
সৌদির আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে ৭ টি জীবন। কিন্তু সেই আগুনের তাপ যেন এখনো পুড়িয়ে যাচ্ছে ৭ টি পরিবারের বুক।
কবরের মাটি শুকিয়ে যাবে, সময়ের সঙ্গে হয়তো কান্নাও কিছুটা থামবে। কিন্তু মা, বাবা, স্ত্রী ও সন্তানদের মনে প্রিয় মানুষটির শূন্যতা থেকে যাবে সারাজীবন।
তাঁরা বিদেশে গিয়েছিলেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। অথচ নিজেরাই আর কোনো দিন হাসিমুখে বাড়ি ফিরতে পারলেন না।



