প্রবাস

রেমিট্যান্স কমলে বাড়বে রিজার্ভ ও অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি

প্রবাসী কর্মীদের বিদেশযাত্রায় বাধা ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় কমতে পারে প্রবাসী আয়; চাপে পড়তে পারে ডলারবাজার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতি

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে ঘিরে। বিশেষ করে সৌদি আরবে বিমানবন্দরগুলোতে হামলা এবং ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্নের কারণে বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না অনেক প্রবাসী। আবার নতুন করে বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কর্মীরাও পড়েছেন অনিশ্চয়তায়।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা কমার পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আর রেমিট্যান্স কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। বাড়তে পারে ডলারের সংকট, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমছে

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বলছে, গত বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ জন কর্মী। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৩২ জনে। অর্থাৎ কর্মী যাওয়ার হার কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সৌদি আরবের শ্রমবাজারে। গত বছর একই সময়ে দেশটিতে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৪ জন। চলতি বছর তা কমে হয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৭ জন। অর্থাৎ কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।

শুধু তাই নয়, অক্টোবরের প্রথম ১২ দিনেও বিদেশে কর্মী যাওয়ার ছাড়পত্র কমেছে। গত বছর এ সময়ে ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ১৪ হাজার ১৭৪ জন। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ১২২ জনে।

ফ্লাইট বাতিলে বিপাকে হাজারো কর্মী

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ থেকে চলাচলকারী ৬১টি ফ্লাইটে প্রভাব পড়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৩৮১ জন যাত্রী।

ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় নতুন কর্মীদের পাশাপাশি ছুটি শেষে কাজে ফিরতে না পারা প্রবাসীরাও পড়েছেন বিপাকে। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া এবং চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের ফ্লাইট ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত করেছে।

রেমিট্যান্স কমলে অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়তে পারে

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স। প্রবাসীরা দেশে যে অর্থ পাঠান, তা শুধু তাঁদের পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটায় না; দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা, আমদানি ব্যয় পরিশোধ এবং ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ফলে বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমে গেলে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হলে দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এর সম্ভাব্য প্রভাব পড়বে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে।

প্রথমত, রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমলে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের সরবরাহ কমে যেতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ডলারের সরবরাহ কমে গেলে আমদানি ব্যয় মেটাতে বাড়তি চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে সংকট দেখা দিতে পারে।

তৃতীয়ত, ডলারের বাজারে অস্থিরতা বাড়লে টাকার বিনিময়মূল্যের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাবে আমদানি পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকবে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।

এ ছাড়া প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর আয় কমে গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি, স্থানীয় বাজার ও ভোগব্যয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

একটি শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থান দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ কোটি ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। তাঁদের প্রায় ৭৯ শতাংশই গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে।

ফলে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ কিংবা শ্রমবাজারের নীতিগত পরিবর্তন বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স খাতকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

এ সংকট মোকাবিলায় নতুন শ্রমবাজার তৈরি, দক্ষ কর্মী গড়ে তোলা এবং ইউরোপ ও এশিয়ার বিকল্প দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে প্রবাসীদের জীবনেও

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব শুধু কর্মসংস্থান কিংবা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। হামলায় হতাহত হচ্ছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরাও।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর হামলায় ১৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আটজন কর্মী হিসেবে নিবন্ধিত ছিলেন। সর্বশেষ হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হওয়ার পাশাপাশি আহত হয়েছেন ২৭ জন।

অন্যদিকে সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি যাত্রী আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কর্মী, ওমরাহযাত্রী এবং ট্রানজিট যাত্রীও ছিলেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে তাঁদের আবাসন, খাবার ও বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: এখনই প্রয়োজন বিকল্প পরিকল্পনা

বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরীর মতে, একটি শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে সংকট তৈরি হয়েছে। ফ্লাইট বাতিলের কারণে নতুন কর্মীদের পাশাপাশি পুরোনো কর্মীরাও কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। এ অবস্থায় ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন।

অন্যদিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিদেশে কর্মসংস্থান কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সরকার নতুন শ্রমবাজার তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আটকে পড়া কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা করা হবে।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসানও মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বিদেশে কর্মীর চাহিদা এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ সংকট মোকাবিলায় সৌদি আরবের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা এবং সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।

 

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য শুধু প্রবাসী কর্মীদের বিদেশযাত্রার সংকট নয়; এটি দেশের অর্থনীতির জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। কারণ প্রবাসী আয় কমে গেলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে, অন্যদিকে ডলারবাজার, আমদানি ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আটকে পড়া কর্মীদের দ্রুত কর্মস্থলে ফেরানো, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, বিকল্প শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করার মতো কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button