প্রবাস

প্রবাসীদের জন্য নতুন কী সুবিধা আনছে সরকার?

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি লাখো পরিবারের জীবিকা নির্বাহে ভূমিকা রাখছে।

প্রবাসীদের এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার বিভিন্ন সময়ে তাঁদের জন্য আর্থিক সহায়তা, ঋণ, বীমা, চিকিৎসা, মরদেহ দেশে আনা, সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি এবং বিদেশে আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করেছে।

তবে এসব সুবিধার অনেক কিছুই প্রবাসী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অজানা। ফলে প্রয়োজনের সময় সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও অনেকে তা গ্রহণ করতে পারেন না।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. নতুন প্রবাসী কার্ড: এক কার্ডে ১০ ধরনের সুবিধা

প্রবাসীদের জন্য সরকারের অন্যতম আলোচিত নতুন উদ্যোগ হলো ‘প্রবাসী কার্ড’। ২০২৬ সালের ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কার্ডটির বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়। পরে ১০ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জনতা ব্যাংকের মধ্যে এ কার্ড চালুর লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা যেসব সুবিধা পাওয়ার কথা:

  • দেশে ও বিদেশে বিমানবন্দরের লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধা।
  • বিশেষ ইমিগ্রেশন বুথের মাধ্যমে দ্রুত সেবা।
  • আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মিট অ্যান্ড গ্রিট সুবিধা।
  • বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ে বিশেষ ছাড়।
  • বিমানবন্দরে পিক অ্যান্ড ড্রপসহ গাড়ি বুকিং সুবিধা।
  • সরকারি হাসপাতালে প্রবাসী সেবা বুথ এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় ছাড়।
  • কার্ডধারীর মৃত্যুর পর বিনা খরচে মরদেহ দেশে পরিবহনের সুবিধা।
  • দেশে ফিরে পুনর্বাসন ও বীমা সুবিধা।
  • জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, ব্যাংকিং ও ঋণসেবায় অগ্রাধিকার।
  • পাসপোর্ট, এনআইডি, কনস্যুলার সেবা ও সরকারি কাজে অগ্রাধিকার।

২. বিদেশে যাওয়ার জন্য সহজ শর্তে ঋণ

বিদেশে চাকরি করতে যাওয়ার সময় অনেক কর্মীকে জমি বিক্রি করতে হয় অথবা উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হয়। তাঁদের সহায়তায় রয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।

  • ব্যাংকের প্রকাশিত অভিবাসন ঋণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী:
  • নতুন ভিসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা।
  • রি-এন্ট্রি ভিসার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা।
  • সুদের হার ৮ শতাংশ (সরল সুদ)।
  • নতুন ভিসার ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩ বছর।
  • রি-এন্ট্রি ভিসার ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ২ বছর।
  • যথাযথ কাগজপত্র পাওয়ার পর সেবা প্রদানের নির্ধারিত সময় ৭ কর্মদিবস।
  • কোনো সার্ভিস চার্জ নেই।

এ ছাড়া ২০২৬ সালে ভাষাশিক্ষা ও বিশেষ দক্ষতা অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণের একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর সুদের হার ১১ শতাংশ এবং মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩ বছর। নির্দিষ্ট যোগ্যতা, ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফার লেটার প্রয়োজন।

 

৩. বিদেশ থেকে দেশে ফিরে পুনর্বাসন ঋণ

বিদেশে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরেছেন কিংবা বিদেশে উপার্জিত অর্থ দিয়ে দেশে ব্যবসা শুরু করতে চান—এমন কর্মীদের জন্য রয়েছে পুনর্বাসন ঋণ।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের প্রকাশিত নীতিমালা অনুযায়ী:

  • সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ।
  • ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণের সুযোগ।
  • ৩ লাখ টাকার বেশি থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সহজ জামানতের ব্যবস্থা।
  • ৫ লাখ টাকার বেশি হলে স্থাবর সম্পত্তি বন্ধকের শর্ত প্রযোজ্য।
  • সুদের হার ৯ শতাংশ (সরল সুদ)।
  • ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর।

যথাযথ কাগজপত্রসহ আবেদন পাওয়ার পর নির্ধারিত সেবা সময় ১০ কর্মদিবস।

ঋণ অনুমোদন অবশ্যই ব্যাংকের যাচাই ও শর্ত পূরণের ওপর নির্ভরশীল।

৪. প্রবাসে কর্মীর মৃত্যু হলে ৩ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা

বিদেশে কর্মরত কোনো বাংলাদেশি কর্মী মারা গেলে তাঁর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী কর্মীর পরিবারকে ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। পাশাপাশি মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ, সার্ভিস বেনিফিট ও বকেয়া পাওনা আদায়েও সহায়তা করা হয়।

এ ছাড়া মৃত কর্মীর মরদেহ দেশে আনা ও দাফনের জন্য বিমানবন্দরে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের সময় ৩৫ হাজার টাকার চেক দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

৫. প্রবাসী কর্মী ও পরিবারের জন্য বীমা সুবিধা

প্রবাসে কর্মরত কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য রয়েছে প্রবাসী কর্মী বীমা।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বীমার মেয়াদ চলাকালে নির্ধারিত শর্তে কর্মী দেশে বা বিদেশে মারা গেলে তাঁর পরিবার বীমার সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারে।

এ ছাড়া চাকরিচ্যুত হয়ে দেশে ফেরার ছয় মাসের মধ্যে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে আবেদন করলে বীমা সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে বীমার মেয়াদ, পলিসির শর্ত এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে আবেদন করতে হবে।

 

৬. প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের মেধাবী সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে শিক্ষাবৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে এ সুবিধা পরিচালিত হয়। যোগ্য শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করতে পারেন।

এ ছাড়া প্রবাসী কর্মীর পরিবারের প্রতিবন্ধী সন্তানদের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতা এবং বিদেশ থেকে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসন সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে।

অনলাইনে আবেদন ও সেবার তথ্য পাওয়া যাবে:

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অনলাইন পোর্টাল ।

portal.wewb.gov.bd

৭. বিদেশে বিপদে পড়লে সরকারি আইনি সহায়তা

বিদেশে কোনো বাংলাদেশি কর্মী নির্যাতন, প্রতারণা, বেতন না পাওয়া, নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ কিংবা আটকে পড়ার মতো সমস্যায় পড়লে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

  • সরকারি সেবার মধ্যে রয়েছে:
  • প্রবাসী কর্মীদের আইনগত সহায়তা।
  • বিদেশে আটকে পড়া কর্মীদের দেশে ফেরাতে সহযোগিতা।
  • দুর্ঘটনায় আহত ও অসুস্থ কর্মীদের আর্থিক সহায়তা।
  • নিয়োগকর্তার কাছ থেকে বকেয়া পাওনা আদায়ে সহযোগিতা।
  • বিপদগ্রস্ত কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা।

প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রমকল্যাণ উইংয়েও যোগাযোগ করতে হবে।

৮. রেমিট্যান্স পাঠালে ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা

বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে রেমিট্যান্স পাঠালে সরকার ঘোষিত ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পাওয়ার সুবিধা অব্যাহত রাখার কথা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জানানো হয়েছে।

অর্থাৎ, যোগ্যতার শর্ত পূরণ করে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠালে প্রবাসী বা তাঁর সুবিধাভোগী পরিবার নির্ধারিত হারে এই প্রণোদনা পেতে পারেন।

উদাহরণ হিসেবে, ১ লাখ টাকা রেমিট্যান্স পাঠালে ২.৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা হবে ২ হাজার ৫০০ টাকা।

তবে ব্যাংক ও লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

৯. নতুন দক্ষতা অর্জন ও বিদেশে চাকরির সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে বেশ কিছু নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • কর্মীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের জন্য স্কিল ভেরিফিকেশন কর্মসূচি।
  • দক্ষ কর্মীদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডিজিটাল সার্টিফিকেট দেওয়ার উদ্যোগ।
  • কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন।
  • বিদেশি ভাষা শেখানোর জন্য প্রশিক্ষক নিয়োগ।
  • নতুন বিদেশি শ্রমবাজার অনুসন্ধানের জন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ।
  • বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ সাপোর্ট সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা।

এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো দক্ষ কর্মী তৈরি, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় প্রতারণা ও হয়রানি কমানো। তবে বাজেটে ঘোষিত উদ্যোগ আর বাস্তবে চালু হওয়া সেবা এক বিষয় নয়।

 

১০. প্রবাসীদের জরুরি যোগাযোগ নম্বর

বিদেশে বা দেশে কোনো প্রবাসী কর্মী সমস্যায় পড়লে সরকারি সহায়তা পেতে নিচের নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করতে পারেন।

Bangladeshi Expatriates Benefits
Bangladeshi Expatriates Benefits

সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে বিদেশগামী কর্মী ও প্রবাসীদের কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।

  • বিদেশ যাওয়ার আগে বিএমইটি নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করুন।
  • পাসপোর্ট, ভিসা, চাকরির চুক্তিপত্র ও বীমার কপি নিজের কাছে এবং পরিবারের কাছে রাখুন।
  • বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে রেমিট্যান্স পাঠান।
  • কোনো দালাল বা প্রতারকের মাধ্যমে সরকারি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করবেন না।
  • সরকারি ঋণ বা অনুদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ নীতিমালা যাচাই করুন।

প্রবাসীদের জন্য সরকারের বিভিন্ন আর্থিক, সামাজিক ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ, সহজ শর্তে ঋণ, মৃত্যুজনিত আর্থিক সহায়তা, বীমা, শিক্ষাবৃত্তি ও আইনি সহায়তা—এসব সুবিধা প্রবাসী কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, শুধু সুবিধা ঘোষণা করলেই হবে না; এসব সেবা যেন দেশের প্রতিটি প্রবাসী ও তাঁদের পরিবারের কাছে সহজে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button