প্রবাসীরা দেশে ফিরে কীভাবে পুনর্বাসন ঋণ পাবেন?
বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার কারণে দেশে ফিরে আসা অনেক প্রবাসী কর্মী আর্থিক সংকটে পড়েন। কেউ চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরেছেন, কেউ নিয়োগকর্তার হয়রানির শিকার হয়ে ফিরছেন।
আবার অনেকে দেশে ফিরে নতুন করে ব্যবসা বা উদ্যোগ শুরু করতে চান, কিন্তু প্রয়োজনীয় পুঁজি জোগাড় করতে পারেন না। এসব প্রবাসীর স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পুনর্বাসন ঋণ দিচ্ছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।
ব্যাংকটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফিরে বৈধ ব্যবসা বা প্রকল্পের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে আগ্রহী প্রবাসী কর্মীরা এ ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে শুধু বিদেশফেরত হলেই ঋণ পাওয়া যাবে না; ব্যাংকের নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে হবে।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের পুনর্বাসন ঋণসেবায় সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী জামানতের শর্তও আলাদা।
- সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ জামানতবিহীন।
- ৩ লাখ টাকার বেশি থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে সহজামানত দিতে হবে।
- ৫ লাখ টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা বা জামিনদারের মালিকানাধীন স্থাবর সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে রেজিস্ট্রি মর্টগেজ দিতে হবে।
ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর। ঋণের ধরন অনুযায়ী কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করতে হবে। ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ ঋণের সুদের হার বার্ষিক ৯ শতাংশ সরল সুদ।
ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশি কোনো নাগরিক চাকরির উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়ার পর রাজনৈতিক, সামাজিক অথবা নিয়োগকর্তার হয়রানির কারণে দেশে ফিরে এসে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য ব্যবসা বা প্রকল্প শুরু করতে চাইলে পুনর্বাসন ঋণের আবেদন করতে পারবেন।
বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বৈধ যেকোনো ব্যবসা বা উদ্যোগের জন্য এ ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রকল্পের বাস্তবতা, আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও জামিনদারের তথ্য যাচাই করে ব্যাংক ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেবে।
পুনর্বাসন ঋণ পেতে প্রকল্প বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যে এলাকায় অবস্থিত, সেই এলাকার প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের শাখায় আবেদন করতে হবে। ব্যাংকের নির্ধারিত আবেদন ফরম বিনামূল্যে সংগ্রহ করা যায়।
আবেদনের সঙ্গে সাধারণত যেসব কাগজপত্র জমা দিতে হবে-
১. আবেদনকারীর সদ্য তোলা ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
২. পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি।
৩. বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের সনদ।
৪. জামিনদারের দুই কপি ছবি, পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং ঠিকানার সনদ।
৫. হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি।
৬. প্রকল্পের বিস্তারিত বিবরণ, ঠিকানা এবং বিগত দুই বছরের আয়-ব্যয়ের বিবরণী।
৭. ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাড়া হলে ভাড়া বা লিজ চুক্তিপত্র এবং প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র; নিজস্ব জায়গা হলে মালিকানার প্রমাণ।
৮. প্রকল্পে আবেদনকারীর নিজস্ব বিনিয়োগের ঘোষণাপত্র।
৯. বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র।
১০. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতার সনদ।
১১. ব্যক্তিগত বা প্রকল্পের নামে অন্য কোনো ব্যাংক, এনজিও বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের ঘোষণাপত্র।
১২. আবেদনকারীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে সচল ব্যাংক হিসাবের ৩ টি স্বাক্ষরিত MICR চেকের পাতা এবং জামিনদারের ব্যাংক হিসাবের ৩ টি স্বাক্ষরিত MICR চেকের পাতা ও হিসাব বিবরণী।
এ ছাড়া জামিনদারের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা থাকতে হবে এবং তাঁর সিআইবি প্রতিবেদন সন্তোষজনক হতে হবে। ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্রও জমা দিতে হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ বিদেশে যাওয়ার আগে মেডিকেলে আনফিট হতে পারেন যেসব কারণে!
প্রথমে যে ব্যবসা বা প্রকল্পের জন্য ঋণ নিতে চান, তার পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এরপর প্রকল্পের অবস্থান অনুযায়ী নিকটস্থ প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করে পুনর্বাসন ঋণের নির্ধারিত আবেদন ফরম সংগ্রহ করতে হবে।
ফরম পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও জামিনদারের তথ্যসহ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর ব্যাংক প্রকল্প, ব্যবসার সম্ভাব্যতা, আবেদনকারীর আর্থিক অবস্থা এবং জামিনদারের তথ্য যাচাই করবে। সবকিছু সন্তোষজনক হলে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যথাযথ কাগজপত্রসহ আবেদন জমা দেওয়ার পর সেবা প্রদানের নির্ধারিত সময় ১৫ কর্মদিবস।
পুনর্বাসন ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংক নির্ধারিত প্রসেসিং ফি ০.৫০ শতাংশ, যা সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা। পাশাপাশি ডকুমেন্টেশন ফি ০.৫০ শতাংশ, এটিও সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা। উভয় ফি-এর সঙ্গে প্রযোজ্য ভ্যাট যুক্ত হতে পারে। তবে সার্ভিস চার্জ বাবদ কোনো ফি নেওয়ার কথা নয়।
পুনর্বাসন ঋণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের নিকটস্থ শাখায় যোগাযোগ করা যাবে। ব্যাংকের প্রকাশিত পুনর্বাসন ঋণসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতর থেকে ১৬২৩৮ নম্বরে এবং বিদেশ থেকে +৮৮০ ৯৬৭৭-৭৮৭৮৭৮ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
এ ছাড়া ব্যাংকের ওয়েবসাইটে পুনর্বাসন ঋণের শর্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আবেদনসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাবে।
বিদেশফেরত কর্মীদের জন্য পুনর্বাসন ঋণ দেশে নতুন করে জীবিকা গড়ে তোলার একটি সুযোগ। তবে ঋণ নেওয়ার আগে ব্যবসার পরিকল্পনা, সম্ভাব্য আয়, ব্যয় ও কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি।
আবেদন করার আগে নিকটস্থ শাখা থেকে সর্বশেষ শর্ত ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিশ্চিত হয়ে নিবেন অবশ্যই।



