শিরোপার বাইরে সৌদি আরবে ফুটবল বিনিয়োগে নতুন হিসাব!
নিউক্যাসল থেকে আল-হিলাল—ফুটবলে সৌদি বিনিয়োগের আসল লক্ষ্য কী?

শুধু ট্রফি জিতলেই ফুটবলে বিনিয়োগের সাফল্য নিশ্চিত হয় না। একটি ক্লাব কতটা স্বনির্ভর হতে পারছে, বাণিজ্যিক আয় কতটা বাড়ছে এবং দেশের সামগ্রিক ক্রীড়া অর্থনীতিতে কতটা অবদান রাখছে—এসব বিষয় দিয়েই সৌদি আরবের ফুটবল বিনিয়োগের প্রকৃত সাফল্য মূল্যায়ন করতে হবে।
সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) ২০২৬-২০৩০ কৌশলে দ্রুত সম্প্রসারণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি আয়, বিনিয়োগের দক্ষতা ও টেকসই মূল্য সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশটির ফুটবল বিনিয়োগের সাফল্য পরিমাপের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এর একটি উদাহরণ ইংলিশ ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেড। ২০২১ সালে পিআইএফের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম ক্লাবটি অধিগ্রহণ করে। এরপর থেকে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বাণিজ্যিক আয়েও অগ্রগতি দেখা গেছে।
২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে নিউক্যাসলের মোট আয় দাঁড়ায় ৩৩৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন পাউন্ড। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় অংশ না নেওয়া সত্ত্বেও ক্লাবটির বাণিজ্যিক আয় বেড়েছে ৪৪ শতাংশ।
তবে এই আয় বৃদ্ধিই যে প্রকৃত আর্থিক সাফল্যের প্রমাণ, তা মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আইনজীবী ফ্রানচেস্কা পেত্রিচিওনের মতে, আয় বৃদ্ধি, হিসাবের মুনাফা এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি—এই তিনটি বিষয় আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
নিউক্যাসল ওই অর্থবছরে কর পরিশোধের পর ৩৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা দেখিয়েছে। তবে হিসাবের মধ্যে সেন্ট জেমস পার্ক স্টেডিয়াম ও সংলগ্ন জমি গ্রুপের অভ্যন্তরে হস্তান্তরের কারণে ১৩৩ দশমিক ২ মিলিয়ন পাউন্ডের এককালীন মুনাফা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ক্লাব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যৎ অবকাঠামো বিনিয়োগের সুবিধার্থে এই পুনর্গঠন করা হয়েছে। তবে পরবর্তী অর্থবছরে প্রিমিয়ার লিগের ন্যায্য বাজারমূল্য পর্যালোচনার পর হিসাবটি সমন্বয় করা হবে।
পেত্রিচিওনের মতে, এ ধরনের লেনদেনের কৌশলগত উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কিন্তু একে নিয়মিত পরিচালন আয় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। বরং প্রকৃত পরিচালন মুনাফা, নগদ প্রবাহ, ব্যতিক্রমী লেনদেন বাদ দিয়ে আয় এবং ক্লাবের আর্থিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ করা জরুরি।
এদিকে আর্থিক নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়েও চাপের মুখে পড়েছে নিউক্যাসল। ২০২৫ সালের ক্যালেন্ডার বছরে উয়েফার ফুটবল আয়ের নিয়ম এবং স্কোয়াড ব্যয়ের ৭০ শতাংশ সীমা অতিক্রম করেছিল ক্লাবটি। এ ঘটনায় ফুটবল আয়ের নিয়মসংক্রান্ত লঙ্ঘনের বিষয়ে তিন বছরের সমঝোতায় যায় নিউক্যাসল। পাশাপাশি স্কোয়াড ব্যয়ের সীমা অতিক্রম করায় ৩ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা করা হয়।
২০২৬-২৭ মৌসুমের শুরুতে প্রিমিয়ার লিগও তাদের আগের লাভ-ক্ষতি ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থাপনা নীতির পরিবর্তে নতুন স্কোয়াড ব্যয় অনুপাত এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার কাঠামো চালু করেছে। নতুন ব্যবস্থায় ফুটবল-সংশ্লিষ্ট আয় ও খেলোয়াড় বিক্রির নিট লাভ-ক্ষতির তুলনায় মাঠের পারফরম্যান্সে ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৫ শতাংশ। উয়েফার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ক্লাবগুলোর জন্য আলাদা ৭০ শতাংশ সীমা কার্যকর রয়েছে।
ক্লাবের বাইরেও সৌদি আরবের লক্ষ্য
সৌদি আরবের ফুটবল বিনিয়োগের হিসাব শুধু নিউক্যাসলের আয়-ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির লক্ষ্য অভ্যন্তরীণ ফুটবল লিগের উন্নয়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, ক্লাব পরিচালনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ২০৩৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সামনে রেখে অবকাঠামো ও পর্যটন খাতকে শক্তিশালী করা।
২০২৩ সালে সৌদি আরবের চারটি বড় ক্লাব আল-হিলাল, আল-নাসর, আল-ইত্তিহাদ ও আল-আহলির ৭৫ শতাংশ মালিকানা নেয় পিআইএফ।
এ ছাড়া চলতি বছরের এপ্রিলে কিংডম হোল্ডিং কোম্পানির কাছে আল-হিলাল ক্লাব কোম্পানির ৭০ শতাংশ মালিকানা বিক্রির চুক্তি করে পিআইএফ। এতে ক্লাবটির এন্টারপ্রাইজ ভ্যালু নির্ধারণ করা হয় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন সৌদি রিয়াল, যা প্রায় ৩৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবের ফুটবল বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পরিমাপ করতে হলে ক্লাবের মুনাফার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, স্পনসরশিপ, সম্প্রচারস্বত্ব থেকে আয়, স্টেডিয়ামের ব্যবহার, কর্মসংস্থান, পর্যটন ব্যয় এবং পরিচালনাগত স্বচ্ছতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
অলিম্পিক রুপাজয়ী ও রিয়াদভিত্তিক সম্প্রচার সাংবাদিক সামান্থা মারে বলেন, শিরোপা জয় দর্শক ও স্পনসর আকৃষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য ক্লাবগুলোকে মাঠের ফলাফলের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সমর্থকদের শুধু আকৃষ্ট করলেই হবে না, তাঁদের নিয়মিত আয় সৃষ্টিকারী একটি সক্রিয় বৈশ্বিক সম্প্রদায়ে পরিণত করতে হবে। এ জন্য সদস্যপদ, পণ্য বিক্রি, গণমাধ্যমভিত্তিক কার্যক্রম, অনুষ্ঠান, ফুটবল একাডেমি এবং সারা বছর স্টেডিয়ামকেন্দ্রিক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সৌদি মডেল কতটা আলাদা?
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর ফুটবল বিনিয়োগ কৌশলও এক নয়। আবুধাবি সিটি ফুটবল গ্রুপের মাধ্যমে একাধিক ক্লাবের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে কাতার প্যারিস সেন্ট জার্মেইকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া, ফ্যাশন ও বিনোদন ব্র্যান্ড তৈরিতে গুরুত্ব দিয়েছে।
সৌদি আরবের কৌশল তুলনামূলক বিস্তৃত। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের মতো আন্তর্জাতিক ক্লাবের পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ লিগ, ক্লাব বেসরকারীকরণ, পর্যটন, বিনোদন এবং বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতিও এই পরিকল্পনার অংশ।
২০২৫ সালে ৭০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঘরোয়া শিরোপা জেতে নিউক্যাসল। পরবর্তী মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগেও জায়গা করে নেয় ক্লাবটি।
তবে সৌদি আরবের ফুটবল বিনিয়োগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শুধু এসব শিরোপা বা মাঠের অর্জনের ওপর নয়। বরং ক্লাবগুলো কতটা নিয়মিত আয় করতে পারে, নিজেদের অর্থায়নে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে পারে এবং দেশের ক্রীড়া অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূল্য তৈরি করতে পারে—সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।
সূত্র: আরব নিউজ।



