
ইতালিতে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বিদেশে নেওয়া হয়েছিল অনেক তরুণদের । কিন্তু স্বপ্নের ইতালি আর দেখা হয়নি। মুম্বাই, সৌদি আরব ও মিশর ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায়। সেখানে দেশীয় দালালদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের হাতে বিক্রি করে দেওয়া হয় তরুণদের। এরপর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন, মারধর ও মুক্তিপণের নামে অর্থ আদায়।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে লিবিয়ার বিভিন্ন বন্দিশালায় আটকে রয়েছেন কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের তিন শতাধিক তরুণ। তাদের মুক্তির জন্য জনপ্রতি ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করছে পাচারকারী চক্র। সন্তানদের জীবন বাঁচাতে জমি, বসতভিটা, স্বর্ণালংকার বিক্রি করে নিঃস্ব হচ্ছেন পরিবারগুলো। কেউ কেউ এরই মধ্যে ৫০ লাখ টাকারও বেশি খরচ করেও স্বজনদের মুক্তি নিশ্চিত করতে পারেননি।
ভৈরবের শম্ভুপুর গ্রামের পারভেজের ঘটনাই এর একটি উদাহরণ। পাঁচ মাস আগে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন তিনি। ঢাকা থেকে মুম্বাই, সেখান থেকে সৌদি আরব, এক সপ্তাহ পর মিশর এবং পরে লিবিয়ার বেনগাজি হয়ে পৌঁছান ত্রিপোলিতে। সেখানে গিয়ে বন্দি হন মানবপাচারকারী চক্রের হাতে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এখন পর্যন্ত পরিবারের খরচ হয়েছে ৫২ লাখ টাকা।
পারভেজের এক স্বজন জানান, বিভিন্ন সময়ে ২০ হাজার, ৪০ হাজার টাকা করে দালালদের দেওয়া হয়েছে। এর কোনো হিসাব নেই। আন্তর্জাতিক মাফিয়াদের হাতে যাওয়ার পরও দালালদের মাধ্যমে মোট ৫২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
শুধু পারভেজ নন, শম্ভুপুর গ্রামের আরও ৩৩ তরুণ লিবিয়ার বিভিন্ন টর্চার সেলে বন্দি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। অভিযোগ রয়েছে, ট্যুরিস্ট ভিসায় কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে তাদের লিবিয়ার ত্রিপোলিতে নেওয়া হয়। সেখানে প্রথমে স্থানীয় দালালদের হাতবদল এবং পরে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। মুক্তির জন্য জনপ্রতি ২৫ লাখ টাকা করে দাবি করা হচ্ছে।
একাধিক পরিবারের অভিযোগ, প্রথমে নির্ধারিত চুক্তির টাকা নেওয়ার পরও দালালরা নানা অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। পারভেজের জন্য ১৮ লাখ টাকা চুক্তি হলেও পরে আরও ১০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। বাইজির জন্য ১৩ লাখ টাকা চুক্তির পর অতিরিক্ত ৯ লাখ টাকার বেশি নেওয়া হয়েছে। একইভাবে হিমেলের জন্য ২২ লাখ টাকা দেওয়ার পরও আরও প্রায় ১০ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে।
বন্দিশালায় আটকে থাকা স্বজনদের আর্তনাদে প্রতিনিয়ত ভারী হচ্ছে পরিবারের পরিবেশ। ফোনে সন্তানদের কান্না আর নির্যাতনের বর্ণনা শুনে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন বাবা-মায়েরা।
এক ভুক্তভোগীর স্বজন বলেন, তার ছেলে ফোন করে কান্নাকাটি করে জানাচ্ছে, তাকে মারধর করা হচ্ছে। বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছে। অন্যদিকে দালালরা ফোন করে টাকা না দিলে গলা কেটে হত্যা এবং হাত-পা কেটে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।
প্রবাসে স্বামীকে পাঠিয়ে এখন নিজেই চরম সংকটে পড়েছেন প্রভা আক্তার। তার স্বামী ওমর ফারুককে মুক্ত করতে এখন পর্যন্ত দালালদের প্রায় ৪০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। প্রভা আক্তার জানান, স্বামীকে ফিরিয়ে আনার আশায় শুধু টাকা দিয়েই যাচ্ছেন। এতে নিজের চিকিৎসা এবং মেয়েকে নিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার সামর্থ্যও হারিয়েছেন তিনি।
লিবিয়ায় বন্দি রয়েছেন মর্জিনা বেগমের একমাত্র ছেলেও। ছেলের মুক্তির আশায় ফসলি জমি, বসতভিটা ও ঘরের অংশ বিক্রি করেছেন তিনি। বিক্রি করেছেন নিজের ও মেয়ের স্বর্ণালংকারও। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা খরচ করেও ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি।
মর্জিনা বেগমের ভাষায়, ছেলে ফোন করে শুধু বাঁচানোর আকুতি জানায়। ২৫ লাখ টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার অনুরোধ করে। স্বামীহারা এই মায়ের এখন আর সম্পদ বলতে তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই।
একই ইউনিয়নের রুবি আক্তারের ছেলেও লিবিয়ায় বন্দি রয়েছেন। ছেলেকে মুক্ত করে দেওয়ার আশ্বাসে দালালচক্র তার স্বামীর জুতার ব্যবসা থেকে ৬ হাজার জোড়া জুতা তৈরি করে নিয়েছে। যার বাজারমূল্য ২০ লাখ টাকার বেশি। এর আগেও চক্রটি ২২ লাখ টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, রাজন নামে স্থানীয় এক দালাল ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রতি ২২ লাখ টাকা চুক্তি করেছিলেন। সেই টাকা রাজনের চাচা আরিফের হাতে তুলে দেন তারা। কিন্তু কয়েক মাস ধরে রাজনের বাড়ি তালাবদ্ধ। উধাও রয়েছেন তার চাচাও।
এ ছাড়া উৎস চন্দ্র নামে এই চক্রের আরেক হোতা লিবিয়ায় বসে পুরো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীদের স্বজনরা।
তাদের দাবি, মুক্তিপণের টাকা না দিলে বন্দিদের ওপর নির্যাতন বাড়ানো হয়। অনেককে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে। নির্যাতনের ভিডিও ও ছবি পরিবারের কাছে পাঠিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা চলছে। এমনকি কেউ কেউ ৪০ লাখ টাকা দেওয়ার পর আরও ২৫ লাখ টাকা দিয়ে মোট ৬৫ লাখ টাকা খরচ করে মুক্তি পেয়েছেন। এরপরও অনেকের মুক্তি মেলেনি।
সম্প্রতি লিবিয়ার টর্চার সেল থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরা দুই যুবকও বর্ণনা দিয়েছেন ভয়াবহ নির্যাতনের। তাদের একজন জানান, ৩২ জনকে একসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর তাদের উলঙ্গ করে মারধর করা হতো। অন্য একজন জানান, বিদেশে নেওয়ার আগেই তাকে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। পিস্তলের বাঁট দিয়ে বুকে আঘাত করা হয়েছে। মারধরের পর ডলার, পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই অবৈধ পথে ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশনের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে অনেক পরিবার দালালদের বিষয়ে যথাযথ খোঁজখবর নেয় না। নির্যাতন বা গ্রেপ্তারের শিকার হওয়ার পরই তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে আসে। শুধু স্থানীয় দালালদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না; অর্থের লেনদেন কোথায় হচ্ছে, লিবিয়ায় আটকে রেখে আদায় করা টাকা কার কাছে যাচ্ছে, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে। এটি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ, তাই পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
ব্র্যাকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের অন্তত ১০টি জেলার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে অন্যতম কিশোরগঞ্জ। সংস্থাটির আরেকটি তথ্যে বলা হয়েছে, বর্তমানে লিবিয়ায় ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ বন্দি রয়েছেন।
ইতালিতে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তরুণরা। সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় পরিবারের শেষ সম্বলটুকুও তুলে দিয়েছিলেন দালালদের হাতে। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে বন্দিজীবন, নির্যাতন আর মুক্তিপণের দুঃস্বপ্নে। স্বজনদের একটাই দাবি—দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক লিবিয়ায় বন্দি তরুণদের এবং মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনা হোক।



