
সৌদি আরবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং হুথি যোদ্ধাদের হামলা জোরদার হওয়ার মধ্যে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীর ভেতরে অবস্থান করছেন দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। নিরাপত্তা হুমকি বেড়ে যাওয়ায় বাংকার-সুবিধাসহ সুরক্ষিত বিভিন্ন প্রাসাদে অবস্থান পরিবর্তন করছেন তিনি। এতে সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করার তাঁর পরিকল্পনা নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সাংবাদিক সামার সাঈদ ও জর্জি কান্টচেভের করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের ওপর ক্রমবর্ধমান হামলা যুবরাজের নেতৃত্বের সামনে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। তাঁর নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তও কীভাবে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে, তা বিশ্লেষণ করেছেন প্রতিবেদকেরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হুথিদের হামলা বাড়তে থাকায় যুবরাজকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা হয়েছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার তাঁকে জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। সেদিন জাতীয় রক্তদান কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানাতে নিজেও রক্ত দিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ৪১ বছর বয়সী যুবরাজ বাংকার-সুবিধাসহ কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থায় সুরক্ষিত বিভিন্ন প্রাসাদে অবস্থান পরিবর্তন করছেন। তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে বাছাই করা একটি বিশেষ দল।
ক্রমবর্ধমান হামলায় রিয়াদের কিছু এলাকা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের মতো পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। শহরটির আর্থিক এলাকার কর্মী, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং কূটনীতিকদের ভবনে অবস্থানকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে অথবা আশ্রয়ে থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হুথিদের হামলা জোরদার হওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন বিদ্যালয় বন্ধ করে অনলাইনে পাঠদান চালু করা হয়েছে।
এদিকে, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় বাড়তে থাকায় অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও চাপ তৈরি হচ্ছে। তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে অন্যান্য খাতে সম্প্রসারণের যে উদ্যোগ নিয়েছেন যুবরাজ, বাড়তি নিরাপত্তা ব্যয় সেই পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানকে কঠিন করে তুলতে পারে। সৌদি আরবকে বৈশ্বিক পর্যটন ও বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষাও এতে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সৌদি কর্মকর্তারা দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী ব্যবস্থার মজুত কমে আসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশাল ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একাধিক স্থানে একযোগে হামলার আশঙ্কা মোকাবিলা করতে হচ্ছে সৌদি আরবকে। এ পরিস্থিতিতে রাজপ্রাসাদ ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর মতো কৌশলগত স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন স্থানের মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। সৌদি আরব পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলায় যোগ দিতে পারে। এর মধ্য দিয়ে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
এর আগে গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে নিজের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন ট্রাম্প। ইয়েমেনে হুথি যোদ্ধাদের প্রভাব ও অগ্রগতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘সবকিছুই ভালোভাবে মিটে যাবে। পরিস্থিতি খুব ভালো হবে।’
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত শনিবারের হামলার দায় স্বীকার করেছে হুথিরা। ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এ ছাড়া সোমবারের আরেকটি হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। হামলার ধারাবাহিকতায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।



