
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি অব্যাহত রাখতে মোট ৩৩০ কোটি ডলারের বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার। ঋণগুলোর শর্ত তুলনামূলক কঠিন হওয়ায় এগুলোকে অনমনীয় ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনমনীয় ঋণ সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির (এসসিএনসিএল) সভায় এসব ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। মোট ৩৩০ কোটি ডলারের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের একটি নতুন প্রকল্পে ২০ কোটি ডলার এবং জ্বালানি আমদানির জন্য ৩১০ কোটি ডলারের ঋণ রয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) বাস্তবায়নাধীন ‘পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট’-এর জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ২০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এ ঋণের মূল লক্ষ্য ঢাকার আশপাশের ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পিবিএস) এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং জলবায়ু সহনশীলতা উন্নত করা।
২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩১ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এর আওতায় নতুন ও বিদ্যমান উপকেন্দ্র সম্প্রসারণ, ভূগর্ভস্থ ও ওভারহেড লাইন নির্মাণ, ইনসুলেটেড কন্ডাক্টর স্থাপন এবং ডিজিটাল মনিটরিং ও ফল্ট লোকেটর প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে। এতে কারিগরি লোকসান বা সিস্টেম লস কমানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন ও উন্নত মানের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
আইটিএফসি থেকে ৩১০ কোটি ডলার
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখতে সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি) থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩১০ কোটি ডলারের স্বল্পমেয়াদি অনমনীয় ঋণও অনুমোদন করেছে এসসিএনসিএল। এ ঋণটি ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানিতে ২৫০ কোটি ডলার এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) এলএনজি আমদানিতে ৬০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাস মেয়াদি এ ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় মাসের টার্ম এসওএফআরের সঙ্গে ১ দশমিক ৭০ শতাংশ যোগ করে। গত বছরের বার্ষিক হারের তুলনায় এ হার কিছুটা কম।
আইটিএফসি নিজস্ব উৎস থেকে ৬০ কোটি ডলার দেবে। বাকি ২৫০ কোটি ডলার কো-ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে সংস্থান করা হবে। জরুরি ভিত্তিতে দেশের জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই ঋণটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে কমিটির নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঋণকে অনমনীয় বলা হচ্ছে যেসব কারণে
ইআরডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনমনীয় বৈদেশিক ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুসরণ করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের বৈদেশিক ঋণের দায় পরিশোধের ব্যয় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ বা রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নিজস্ব আয় থেকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার বিবেচনা করেই বড় অঙ্কের এ ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে।
ইআরডির সভার কার্যপত্রে বলা হয়েছে, এডিবির ২০ কোটি ডলারের ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে সিকিউর্ড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেটের (এসওএফআর) সঙ্গে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ স্প্রেড যোগ করে। ঋণটির মেয়াদ ২৫ বছর এবং এর মধ্যে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে।
এ ছাড়া ঋণটিতে শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ ম্যাচিউরিটি প্রিমিয়াম এবং শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ কমিটমেন্ট চার্জ রয়েছে। ঋণটির গ্র্যান্ট এলিমেন্ট মাত্র ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। সাধারণভাবে ২৫ শতাংশের কম গ্র্যান্ট এলিমেন্ট থাকলে কোনো ঋণকে কঠিন শর্তের বা অনমনীয় ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।



