
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলো বর্তমানে যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি এ সতর্কবার্তা দিয়েছে।
সংস্থাটির নতুন প্রতিবেদন এমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬: দ্য পয়েন্ট অব রিটার্ন-এ বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে দেশগুলোর বর্তমান জলবায়ুনীতি ও প্রতিশ্রুতির মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। জাতীয়ভাবে নির্ধারিত জলবায়ু প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হলেও শতাব্দীর শেষে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নিট-শূন্য নিঃসরণের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা গেলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে হলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমাতে হবে। ২০২৫ সালের নিঃসরণের মাত্রাকে ভিত্তি ধরে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১৮ শতাংশ, ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৬৯ শতাংশ কমানো প্রয়োজন।
কিন্তু দেশগুলোর বর্তমান জলবায়ু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নিঃসরণ কমার সম্ভাবনা মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই হ্রাস ১১ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের ঘোষিত লক্ষ্যের সঙ্গে দেশগুলোর বাস্তব পদক্ষেপের বড় ব্যবধান রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে, কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে নিঃসরণ কমানোর কাজে প্রতি পাঁচ বছর দেরির কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতার সর্বোচ্চ মাত্রা প্রায় ০ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ যত পিছিয়ে যাবে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সীমিত রাখার কাজ তত কঠিন হবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা সাময়িকভাবে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করলেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রচেষ্টা ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখতে এখনই গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর গতি বাড়াতে হবে। এ জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ নিঃসরণ কমানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রতিটি অতিরিক্ত ভগ্নাংশের সঙ্গে বন্যা, তাপপ্রবাহ ও দাবানলের মতো জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ে। তবে জরুরি ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে নিঃসরণ কমানো সম্ভব।
প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির অগ্রগতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পর নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ সময়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির হার আগের প্রত্যাশার তুলনায় তিন গুণ হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের গতিও আগের প্রত্যাশার তুলনায় সাত গুণ বেশি হয়েছে।
এ অগ্রগতি থেকে বোঝা যায়, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর ফল পেতে এই অগ্রগতি আরও দ্রুত করতে হবে এবং আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দিতে হবে।
ইউএনইপির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের নীতিগত উদ্যোগগুলো গড়ে ৯ শতাংশ নিঃসরণ কমাতে ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া কার্বন নিঃসরণ বাণিজ্যব্যবস্থা ও কার্বন করের মতো অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে মূল্যায়নকালজুড়ে বিভিন্ন খাতে ৫ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত নিঃসরণ কমানোর নজির পাওয়া গেছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ঝুঁকি কমাতে প্রতিবেদনে কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি, মিথেন নিঃসরণ কমানো এবং বন উজাড় বন্ধ করা। পাশাপাশি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ করে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা সাময়িকভাবে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার পর শতাব্দীর শেষে আবার সেই সীমায় ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য পথে এ শতাব্দীতে প্রায় ৩২০ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডল থেকে অপসারণ করে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে হতে পারে। তবে এ পরিমাণ কার্বন অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, ব্যয় এবং এত বড় পরিসরে তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশ্বের দেশগুলোর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঘোষিত জলবায়ু লক্ষ্যকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়া। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমানো এবং জ্বালানিব্যবস্থায় রূপান্তরের গতি বাড়ানো না গেলে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।



