জাতীয়

গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ, দ্রুত কাজ শুরু করবে মজুরি বোর্ড

পোশাকশিল্পের কর্মীদের ন্যূনতম বেতন ঠিক করতে গঠিত মজুরি বোর্ড অল্প সময়ের মধ্যেই কার্যক্রম শুরু করবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এদিকে চলমান আন্দোলন থেকে সরে এসে শ্রমিকদের কারখানায় কাজে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি সড়ক-মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার আহ্বানও জানান মন্ত্রী।

সোমবার (২ নভেম্বর) বিকেলে শ্রমিক ও কারখানার মালিকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এসব তথ্য জানান।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রোববার সকালে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সোমবারই বোর্ডের প্রথম সভা হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে দেরি না করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বৈঠক আয়োজন করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের অন্যতম দাবি ছিল দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করে ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করা। এ জন্য শ্রমমন্ত্রী মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের প্রতিনিধির নাম চেয়েছিলেন। মালিকপক্ষ দ্রুত নাম দিলেও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি চূড়ান্ত করতে কিছুটা সময় লাগে। শনিবার রাতে শ্রমিক প্রতিনিধিদের নাম চূড়ান্ত হওয়ার পরদিনই বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ফলে এ কাজে কোনো অযথা দেরি করা হয়নি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি মালিকদের মতামত ও শিল্পের স্বার্থও দেখতে হবে, যাতে কারখানার উৎপাদন ও রপ্তানিতে কোনো বাধা না আসে।

তবে মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্বার্থ যেন বেশি গুরুত্ব পায়, সরকার সে চেষ্টা করবে বলে জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, শিল্পের উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের কল্যাণ—দুই বিষয় মাথায় রেখে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য শিল্পবান্ধব ও শ্রমিকবান্ধব নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

শ্রমিকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের দাবি থাকতে পারে এবং তাঁরা নিজেদের অধিকার আদায়ে আন্দোলনও করতে পারেন। তবে দাবি জানানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা প্রয়োজন। প্রথমে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিতে হবে। এরপর মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।

শ্রমিকদের দাবি তুলে ধরার জন্য মজুরি বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে গার্মেন্টস মালিকরা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে সড়কে ঘটে যাওয়া সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিক বা শ্রমিকনেতাদের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, গত কয়েক দিনের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে কিছু মুখোশধারী ব্যক্তির উপস্থিতি দেখা গেছে। তাঁদের কর্মকাণ্ডের কারণে শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদেরই ক্ষতি হতে পারে।

আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, তাঁদের আইনিভাবে মুক্তির বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে। পাশাপাশি আন্দোলন ও সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের বিষয়েও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এখন সবাইকে আবার কারখানায় ফিরে যেতে হবে। উৎপাদন চালু রাখতে হবে এবং স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সড়ক-মহাসড়কে অস্থিরতা তৈরি করছে, তারা শ্রমিকদের প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না।

শ্রমিকনেতাদেরও নিজ নিজ সংগঠনের কর্মীদের কাজে ফেরার আহ্বান জানানোর অনুরোধ করেন তিনি। মজুরি বোর্ডে শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধি থাকায় সেখানে শ্রমিকদের দাবি তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিক ও মালিক—দুই পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। মালিকের বিনিয়োগ এবং শ্রমিকের পরিশ্রম একসঙ্গে মিলেই উৎপাদন বাড়ায় ও দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়।

তাই কারখানা চালু রাখা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং দেশের রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশে বেকারত্বের হার যাতে না বাড়ে, সে জন্য মিল-কারখানাগুলো সচল রাখা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বৈঠকে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এবং শ্রমিকনেতা ও সংসদ সদস্য শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মির্জা আল শামীম, মো. মোস্তফা, অরবিন্দু বেপারী বিন্দু, আকাশ আহমেদ বাবুল, শাকিল হোসেন মোবারক, আমীর হামজা খান, তৌহিদুর রহমান, মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, লাভলী ইয়াসমীন ও জাকির হোসেন।

এর আগে সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে শ্রমমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, শ্রমিকনেতা শিমুল বিশ্বাস ছাড়াও মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন কত নির্ধারণ করা হবে, এখন সেদিকেই নজর তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button