
সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কাজগুলোর একটি। তবে এই কাজ করতে গিয়ে অনেকেই হাঁটুতে ব্যথা অনুভব করেন। বিশেষ করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় ব্যথা হলে হাঁটুর জোড়, আশপাশের পেশি কিংবা রগে কোনো সমস্যা আছে কি না, তা খেয়াল করা প্রয়োজন। হাঁটুর সামনের অংশে ব্যথা, জোড় শক্ত হয়ে যাওয়া কিংবা নড়াচড়ায় অস্বস্তির পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
হাঁটুতে ব্যথা হলেই যে গুরুতর কোনো সমস্যা হয়েছে, তা নয়। তবে ব্যথা বারবার হলে বা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় হাঁটুতে ব্যথার সম্ভাব্য পাঁচটি কারণ জেনে নেওয়া যাক।
১. হাঁটুর সামনের অংশে ব্যথা
হাঁটুর সামনের দিকে বা হাঁটুর চাকতির আশপাশে ব্যথার একটি সাধারণ কারণ হলো প্যাটেলোফেমোরাল পেইন। হাঁটুর চাকতি ও উরুর হাড়ের সংযোগস্থলে চাপের পরিবর্তন হলে এ ধরনের ব্যথা হতে পারে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা, হাঁটু ভাঁজ করে বসা, মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসা কিংবা দীর্ঘ সময় হাঁটু ভাঁজ করে বসে থাকলে ব্যথা বাড়তে পারে।
কারেন্ট ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় এ ধরনের ব্যথার বিভিন্ন কারণ তুলে ধরা হয়েছে। বড় কোনো আঘাত ছাড়াও ধীরে ধীরে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। উরু ও নিতম্বের পেশি দুর্বল হওয়া, পেশির নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, পায়ের গঠনগত বৈশিষ্ট্য এবং হঠাৎ শারীরিক পরিশ্রম বাড়ানোর কারণে হাঁটুর ওপর চাপ বেড়ে যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে হাঁটুর সামনে ভোঁতা ব্যথা, চাপ বা কখনো তীক্ষ্ণ অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে বারবার হাঁটু ভাঁজ ও সোজা করার সময় ব্যথা বাড়তে পারে।
২. হাঁটুর অস্থিসন্ধির ক্ষয়
হাঁটুর অস্থিসন্ধিতে অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা ক্ষয়জনিত সমস্যা দেখা দিলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা কষ্টকর হতে পারে। এ অবস্থায় অস্থিসন্ধির তরুণাস্থি ও আশপাশের টিস্যুতে পরিবর্তন ঘটে। ফলে ব্যথা, জড়তা এবং হাঁটাচলায় অসুবিধা দেখা দিতে পারে।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা, হাঁটা কিংবা ঢালু পথে চলার সময় ব্যথা বাড়তে পারে। কারও কারও হাঁটু ফুলে যায়, স্পর্শে ব্যথা লাগে অথবা বিশ্রামের পর জোড় শক্ত মনে হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে এ সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। তবে আগের কোনো আঘাত, অতিরিক্ত ওজন এবং অস্থিসন্ধির ওপর দীর্ঘদিন বেশি চাপ পড়ার কারণেও অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৩. উরু ও নিতম্বের পেশি দুর্বল হওয়া
হাঁটুর স্বাভাবিক নড়াচড়ায় উরু ও নিতম্বের পেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব পেশি শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে, হাঁটুর নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করতে এবং নড়াচড়ার সময় সৃষ্ট চাপ সামলাতে সাহায্য করে।
পেশিগুলো দুর্বল হলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার মতো কাজে হাঁটুর ওপর চাপ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকা কিংবা হঠাৎ ব্যায়ামের পরিমাণ বাড়ানোর পর এ সমস্যা বেশি অনুভূত হতে পারে।
হাঁটুর ব্যথা নিয়ন্ত্রণে উরু ও নিতম্বের পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম উপকারী হতে পারে। তবে ব্যথার কারণ না জেনে নিজে থেকে কঠিন ব্যায়াম শুরু করা উচিত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ব্যায়াম বেছে নেওয়া ভালো।
৪. হাঁটুর নিচের রগে সমস্যা
হাঁটুর চাকতিকে পায়ের নিচের হাড়ের সঙ্গে যুক্ত করে প্যাটেলার টেন্ডন বা রগ। এই রগে বারবার অতিরিক্ত চাপ পড়লে প্যাটেলার টেন্ডিনোপ্যাথি হতে পারে। খেলাধুলায় নিয়মিত লাফানো বা দৌড়ানোর মতো কাজ করেন, এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। একে কখনো কখনো ‘জাম্পারস নি’ বা লাফানোর কারণে হাঁটুর সমস্যা বলা হয়।
ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় প্যাটেলার টেন্ডনের এ ধরনের সমস্যার কথা উল্লেখ রয়েছে। হাঁটুর চাকতির ঠিক নিচে ব্যথা অনুভূত হওয়া এর অন্যতম লক্ষণ। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা, দৌড়ানো, লাফানো কিংবা হাঁটুর ওপর বারবার চাপ পড়ে এমন কাজের সময় ব্যথা বাড়তে পারে।
এ ধরনের সমস্যা হলে ব্যথা উপেক্ষা করে একই মাত্রায় শারীরিক পরিশ্রম চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের চাপ কমানো এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৫. হঠাৎ ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম বাড়ানো
কখনো কখনো হাঁটুতে ব্যথার কারণ হতে পারে হঠাৎ শারীরিক পরিশ্রম বাড়িয়ে দেওয়া। নতুন করে ব্যায়াম শুরু করা, আগের তুলনায় বেশি হাঁটা বা দৌড়ানো, ধাপে ধাপে ব্যায়াম করা কিংবা হঠাৎ বেশি সিঁড়ি ব্যবহার করলে হাঁটুর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
শরীরকে নতুন কাজের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় না দিলে হাঁটুর আশপাশের পেশি, রগ ও অন্যান্য টিস্যুতে চাপজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফলে ব্যথা ও প্রদাহ হতে পারে। বিশেষ করে প্যাটেলোফেমোরাল ব্যথা শারীরিক কার্যকলাপের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পর দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের সমস্যা এড়াতে ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রমের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ানো, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং ব্যথা বাড়লে কাজের চাপ কমানো প্রয়োজন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় হাঁটুতে ব্যথা হলে তার কারণ নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যথা দীর্ঘদিন থাকলে, ক্রমে বাড়লে, হাঁটু ফুলে গেলে কিংবা হাঁটাচলায় সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আঘাতের পর হাঁটুতে তীব্র ব্যথা, অস্বাভাবিক ফোলা, পায়ে ভর দিতে না পারা অথবা হাঁটু লাল ও গরম হওয়ার সঙ্গে জ্বর থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
হাঁটুর ব্যথার কারণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। তাই সঠিক কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, ব্যায়াম ও দৈনন্দিন কাজের পরিবর্তন করাই ব্যথা নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত উপায়।



