বিমানে ওঠার আগে এই ভুল করলে আটকে যেতে পারে আপনার যাত্রা

বিদেশযাত্রা কিংবা দেশের ভেতরে বিমানে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা না থাকলে পড়তে হতে পারে নানা রকম বিড়ম্বনায়।
কখনো প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাব, কখনো লাগেজে নিষিদ্ধ জিনিস, আবার কখনো সময়মতো চেক-ইন না করার কারণে ফ্লাইট মিস করার ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে প্রথমবার বিমানে ভ্রমণকারীদের এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
বিমানবন্দরে যাত্রার আগে কয়েকটি সাধারণ ভুল এড়িয়ে চললে ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। যেসব ভুল কোনোভাবেই করা উচিত নয়, সেগুলো হলো-
বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে পাসপোর্ট, ভিসা, বিমানের টিকিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে না রাখা বড় ভুল। গন্তব্য দেশের নিয়ম অনুযায়ী রিটার্ন টিকিট, হোটেল বুকিং, আমন্ত্রণপত্র, কাজের অনুমতিপত্র বা অন্যান্য নথিও প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষ করে পাসপোর্টের মেয়াদ, ভিসার ধরন, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং টিকিটে থাকা নামের সঙ্গে পাসপোর্টের নাম মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। ট্রানজিট থাকলে মাঝের দেশের প্রবেশ বা ট্রানজিট ভিসার প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও আগে যাচাই করতে হবে।
অনেক যাত্রী ফ্লাইট ছাড়ার অল্প সময় আগে বিমানবন্দরে পৌঁছান। এতে চেক-ইন, লাগেজ জমা, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী নির্দেশনায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য অন্তত চার ঘণ্টা আগে চেক-ইন কাউন্টারে উপস্থিত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের নির্ধারিত সময়ও যাচাই করতে হবে। কারণ চেক-ইন কাউন্টার বন্ধ হয়ে গেলে টিকিট থাকলেও ফ্লাইটে ওঠার সুযোগ নাও মিলতে পারে।
প্রতিটি এয়ারলাইনসের লাগেজ বহনের নিয়ম এক নয়। টিকিটের ধরন, গন্তব্য, ভ্রমণের শ্রেণি ও রুট অনুযায়ী বিনা খরচে লাগেজ নেওয়ার সীমা পরিবর্তিত হতে পারে।
নির্ধারিত সীমার বেশি ওজন হলে অতিরিক্ত চার্জ দিতে হতে পারে। আবার কেবিন ব্যাগের মাপ নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলে সেটি বিমানের ভেতরে নেওয়ার অনুমতি নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই যাত্রার আগে টিকিটে উল্লেখ করা লাগেজের ওজন ও সংখ্যা যাচাই করা উচিত।
নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় অনেক যাত্রীর ব্যাগ থেকে নিষিদ্ধ সামগ্রী পাওয়া যায়। এতে তল্লাশিতে সময় নষ্ট হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিনিসপত্র জমা দিতে বা ফেলে দিতে হয়।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্দেশনা অনুযায়ী, কেবিন ব্যাগে ১০০ মিলিলিটারের বেশি তরল নেওয়া যায় না। শ্যাম্পু, ক্রিম, জেল, লোশন, পারফিউম ও স্প্রের মতো পণ্যও এই বিধিনিষেধের আওতায় পড়ে। ছুরি, কাঁচি, ব্লেড, লাইটার ও এ ধরনের ধারালো বা ঝুঁকিপূর্ণ জিনিসও হ্যান্ড ব্যাগে নেওয়া নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ।
মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও পাওয়ার ব্যাংকের মতো যন্ত্রে লিথিয়াম ব্যাটারি থাকে। এসব জিনিস বহনের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম রয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্দেশনায় পাওয়ার ব্যাংকসহ লিথিয়াম ব্যাটারিযুক্ত ডিভাইস চেক-ইন বা বুকিং লাগেজে না রাখার কথা বলা হয়েছে। এগুলো কেবিন ব্যাগে রাখতে হয়।
তবে ব্যাটারির ক্ষমতা ও এয়ারলাইনসের নিয়ম অনুযায়ী বহনের সীমা থাকতে পারে। তাই যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের নির্দেশনা দেখে নেওয়া জরুরি।
পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট, নগদ অর্থ, মূল্যবান গয়না, মোবাইল ফোন ও জরুরি ওষুধ চেক-ইন লাগেজে রাখা উচিত নয়। কারণ লাগেজ দেরিতে পৌঁছানো, হারিয়ে যাওয়া বা অন্য কোনো কারণে যাত্রীর প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের কাছে নাও থাকতে পারে।
এসব জিনিস প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ কেবিন ব্যাগে রাখা নিরাপদ। নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হলে ওষুধের মূল প্যাকেট ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাপত্র সঙ্গে রাখা ভালো।
আরও পড়ুনঃ বিদেশ থেকে দেশে ফিরলে কতটি মোবাইল ও ল্যাপটপ আনতে পারবেন প্রবাসীরা?
ইমিগ্রেশনে ভ্রমণের উদ্দেশ্য, গন্তব্য, থাকার ঠিকানা কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে চাওয়া হতে পারে। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্য দেওয়া উচিত নয়।
ভ্রমণের উদ্দেশ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে। বিদেশে কাজের জন্য গেলে কাজের অনুমতিপত্র, নিয়োগসংক্রান্ত নথি এবং প্রযোজ্য ছাড়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে অনুমান করে ভুল তথ্য না দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানানো উচিত।
অনেক সময় পরিচিত বা অপরিচিত কেউ বিদেশে যাওয়ার সময় অন্যের জন্য কোনো প্যাকেট বা ব্যাগ পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেন। যাচাই না করে এসব জিনিস নিজের লাগেজে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
প্যাকেটের ভেতরে কী আছে, তা না জানলে নিষিদ্ধ বা বিপজ্জনক কোনো সামগ্রী বহনের দায়ে যাত্রী নিজেই সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই নিজের নয়, এমন কোনো প্যাকেট বা ব্যাগ বহন না করাই নিরাপদ।
চেক-ইন ও ইমিগ্রেশন শেষ হওয়ার পর অনেক যাত্রী কেনাকাটা, খাবার কিংবা বিশ্রামে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ সময় বোর্ডিংয়ের ঘোষণা বা গেট পরিবর্তনের তথ্য খেয়াল না করলে ফ্লাইট মিস হতে পারে।
বোর্ডিং পাসে উল্লেখ করা গেট নম্বর দেখে নিতে হবে। পাশাপাশি বিমানবন্দরের ডিসপ্লে বোর্ডে ফ্লাইটের সময় ও গেটের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। বোর্ডিং শুরু হলে দেরি না করে নির্ধারিত গেটে পৌঁছাতে হবে।
একই ধরনের ব্যাগ অনেক যাত্রীর থাকতে পারে। ফলে ভুল করে অন্যের লাগেজ নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। নিজের ব্যাগে নাম, ফোন নম্বর ও প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যযুক্ত ট্যাগ লাগানো যেতে পারে। ব্যাগের রং বা নকশা সহজে চেনা যায়, এমনভাবে চিহ্নিত করাও ভালো উপায়।
গন্তব্যে পৌঁছে লাগেজ সংগ্রহের সময় ট্যাগ ও ব্যাগের পরিচয় মিলিয়ে নিতে হবে। লাগেজ না পাওয়া গেলে বিমানবন্দর ছাড়ার আগেই সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে।
নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় কর্মীদের নির্দেশনা অনুসরণ না করা, অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণ করা কিংবা নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করা উচিত নয়। নিরাপত্তাকর্মীরা কোনো জিনিস পরীক্ষা করতে চাইলে সহযোগিতা করতে হবে।
চিকিৎসার প্রয়োজনে সিরিঞ্জ, বিশেষ যন্ত্র বা তরল ওষুধ বহন করতে হলে আগে থেকেই এয়ারলাইনসের নিয়ম জেনে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাপত্র সঙ্গে রাখা উচিত।
একেক দেশের শুল্ক, ওষুধ, খাদ্যপণ্য, নগদ অর্থ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী বহনের নিয়ম আলাদা। বাংলাদেশ থেকে কোনো পণ্য নিয়ে যাওয়া যাবে মানেই গন্তব্য দেশেও সেটি অনুমোদিত এমন নয়।
বিশেষ করে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ, খাদ্যদ্রব্য, তামাকজাত পণ্য, নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী বহনের ক্ষেত্রে গন্তব্য দেশের নিয়ম আগে যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস, কাস্টমস বা সরকারি ওয়েবসাইট থেকে তথ্য নিতে হবে।
বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট ও প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র সঙ্গে আছে কি না নিশ্চিত করুন। লাগেজের ওজন ও মাপ যাচাই করুন। নিষিদ্ধ সামগ্রী সরিয়ে ফেলুন এবং ফ্লাইটের সময়, টার্মিনাল ও চেক-ইন সংক্রান্ত তথ্য এয়ারলাইনসের কাছ থেকে জেনে নিন।
প্রথমবার বিদেশে গেলে বিমানবন্দরে প্রবেশের পর কোনো বিষয়ে বিভ্রান্ত হলে দালাল বা অপরিচিত ব্যক্তির সাহায্য না নিয়ে বিমানবন্দরের তথ্যকেন্দ্র, এয়ারলাইনসের কর্মী কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
বিমানযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে নিয়ম জানা এবং তা মেনে চলার বিকল্প নেই। একটু আগাম প্রস্তুতি ও সতর্কতাই পারে ফ্লাইট মিস, অতিরিক্ত খরচ কিংবা অপ্রয়োজনীয় আইনি জটিলতা থেকে যাত্রীকে রক্ষা করতে।



