প্রবাস

নারী গৃহকর্মীদের জন্য সৌদি আরব কতটা নিরাপদ কর্মস্থল?

সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনার পর বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে।

কাজের সন্ধানে সৌদি আরবে যাওয়া অনেক নারীকে নির্যাতন, বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও যৌন হয়রানির মতো সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমালেও অনেক নারীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বেতন না পাওয়া এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে দেশে ফিরতে হচ্ছে। শ্রমিকদের সুরক্ষায় সৌদি আরবের আইন ও বিধিবিধানে পরিবর্তন আনা হলেও বাস্তবে নির্যাতনের অভিযোগ কমছে না।

গত কয়েক বছরে বিদেশে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি নারী কর্মীদের বড় একটি অংশের গন্তব্য সৌদি আরব। এরপর রয়েছে জর্ডান। তবে সৌদি আরবে যাওয়া নারী কর্মীর সংখ্যা জর্ডানে যাওয়া কর্মীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১ লাখ ৭২ হাজারের বেশি নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব।

অন্যদিকে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি নারী কর্মী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় এক হাজারই ফিরেছেন সৌদি আরব থেকে।

দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বেতন আটকে রাখা, বেতন চাইতে গিয়ে হয়রানি এবং যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনা তাঁদের দেশে ফিরে আসার অন্যতম কারণ।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি প্রেস এজেন্সির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গৃহকর্মী ও একই ধরনের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের নিয়োগসংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধন করেছে দেশটির সরকার।

সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, নিয়োগকর্তারা কর্মীদের চুক্তিতে উল্লেখ নেই—এমন কোনো কাজ করতে বাধ্য করতে পারবেন না। তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করানোও নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে কর্মীদের স্বাস্থ্য, শারীরিক নিরাপত্তা কিংবা মর্যাদার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এমন কাজেও তাঁদের নিয়োজিত করা যাবে না।

আরও পড়ুনঃ প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন? দেশ ছাড়ার আগে অবশ্যই জেনে নিন এই ১০ বিষয়

কিন্তু আইন ও বিধিমালায় পরিবর্তন আনার পরও বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কাগজে-কলমে সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও কর্মক্ষেত্রে তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কি না।

সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের যাওয়া শুরুর সুনির্দিষ্ট সময় নিয়ে পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে কয়েকটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দুই থেকে আড়াই দশক ধরে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বিপুলসংখ্যক নারী দেশটিতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন।

সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়। এরপর থেকে ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি দেশটিতে কাজ করছেন। বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসও সৌদি আরব থেকে আসা রেমিট্যান্স।

গত দশকের শুরুর দিকে সৌদি আরব থেকে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নারী কর্মী নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে দেশে ফিরে আসায় বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে দুই দেশের মধ্যে গৃহকর্মী নিয়োগসংক্রান্ত একটি চুক্তি হয়।

দুই বছর মেয়াদি ওই চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের মাসে ৮০০ সৌদি রিয়াল বেতন পাওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি বিনা খরচে তাঁদের সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

তবে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর ভাষ্য, অনেক নারী কর্মী চুক্তি অনুযায়ী বেতন পাননি। কেউ বেতন চাইতে গিয়ে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আবার কাউকে কাজের পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরে আসতে হয়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চুক্তি করলেই কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত হয় না। চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।

সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের পেছনে প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত দক্ষতার ঘাটতিকেও একটি কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

রিয়াদ ও জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সূত্রগুলোর ভাষ্য, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা ছাড়াই অনেক নারীকে সৌদি আরবে পাঠানো হচ্ছে। ফলে নতুন পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন।

তবে প্রশিক্ষণ বা ভাষাগত দক্ষতার ঘাটতি কোনোভাবেই নির্যাতন, বেতন আটকে রাখা কিংবা কর্মীর প্রতি অমানবিক আচরণের বৈধতা দিতে পারে না। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়োগকর্তারও।

সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের নতুন প্রমাণ উঠে এসেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে।

সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধান রয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির সরকার। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে সৌদি সরকারের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে।

সৌদি সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় মানসম্মত কর্মচুক্তি, মজুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা, বিমা কর্মসূচি এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা চালু রয়েছে। নির্যাতন বা বিধিবিধান লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের সুযোগও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি জানিয়েছে, গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় নেওয়া সংস্কার ও অন্যান্য পদক্ষেপের বাস্তবায়ন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে সৌদি সরকারের কাছে অনুরোধ করা হলেও তারা জবাব দেয়নি।

ফলে আইন ও বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনের অভিযোগ অব্যাহত থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে কর্মীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু নতুন চুক্তি বা আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। বিদেশে যাওয়ার আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, কর্মচুক্তির শর্ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা, নিয়োগকর্তার পরিচয় ও কর্মপরিবেশ যাচাই এবং নিয়মিত তদারকি জরুরি।

একই সঙ্গে কর্মীদের হাতে চুক্তির অনুলিপি, দূতাবাস ও জরুরি সহায়তার যোগাযোগ নম্বর এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে। বেতন পরিশোধ, কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, ছুটি ও নিরাপদ আবাসনের শর্ত বাস্তবে মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগীকে নিরাপদ আশ্রয় এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা। দেশে ফেরত আসা কর্মীদের পুনর্বাসন ও তাঁদের অভিযোগের তথ্য সংরক্ষণও জরুরি।

সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদান যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাঁদের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিদেশে কর্মরত হাজারো নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button