রেমিট্যান্স ছাড়া কতটা চাপে পড়বে বাংলাদেশ?
বিশেষ অর্থনৈতিক ফিচার : রেমিট্যান্স বাড়লেও কমছে বিদেশে কর্মসংস্থানের গতি , হুন্ডি বন্ধ না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি

একদিকে রপ্তানি আয়ে চাপ, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা ও আমদানি ব্যয়ের চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি হয়ে উঠেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কঠোর পরিশ্রম করা লাখো প্রবাসীর পাঠানো ডলার শুধু তাঁদের পরিবারের জীবনযাত্রাই বদলাচ্ছে না, সচল রাখছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, শক্তিশালী করছে রিজার্ভ এবং অর্থনীতিকে দিচ্ছে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রবাসীদের এই অবদান অর্থনীতিকে কতটা এগিয়ে নিচ্ছে? আর এই আয়ের বিপরীতে প্রবাসীরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কতটা সুরক্ষা ও সম্মান পাচ্ছেন?
রেকর্ড রেমিট্যান্স, নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব কতটা বেড়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশীয় মুদ্রায় ডলারপ্রতি ১২৩ টাকা হিসাবে যার পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
এটি দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ। শুধু তাই নয়, গত অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৯৬ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অক্টোবর মাসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে দেশে এসেছে প্রায় ১১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৩ শতাংশ।
অর্থনীতির জন্য রেমিট্যান্স কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
শুধু অক্টোবর মাসেই এসেছে প্রায় ২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বৈশ্বিক নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে।
রেমিট্যান্সকে শুধু বিদেশ থেকে দেশে আসা অর্থ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির একাধিক গুরুত্বপূ র্ণ খাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রথমত, রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। বাংলাদেশকে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যয় করতে হয়। রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে ডলারের সরবরাহ বাড়লে আমদানি ব্যয় মেটানো এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে তা ছিল প্রায় ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার।
তৃতীয়ত, রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সামগ্রিক ব্যালান্স অব পেমেন্টে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এই উদ্বৃত্ত ছিল ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বাণিজ্য ঘাটতির চাপের মধ্যেও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ দেশের বৈদেশিক অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করছে।
রপ্তানি আয়ের সঙ্গে রেমিট্যান্সের তুলনা
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটি উৎস হচ্ছে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৪৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ পণ্য রপ্তানি থেকে প্রতি ১০০ ডলার আয় হলে তার বিপরীতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭৪ ডলার।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—রপ্তানি আয় আসে দেশের উৎপাদন ও পণ্য বিক্রির মাধ্যমে, আর রেমিট্যান্স আসে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের শ্রমের বিনিময়ে। দুটি আয়ের প্রকৃতি আলাদা হলেও বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহে উভয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে এই তুলনাই দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান কতটা বিশাল।
কোন দেশ থেকে আসছে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলো থেকেও বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসছে।
প্রবাসী আয়ের শীর্ষ উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে—
দেশ রেমিট্যান্স
সৌদি আরব ৫.৮৫ বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাজ্য ৫.০৭ বিলিয়ন ডলার
সংযুক্ত আরব আমিরাত ৪.৫৮ বিলিয়ন ডলার
মালয়েশিয়া ৩.৪০ বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাষ্ট্র ৩.০১ বিলিয়ন ডলার
ইতালি ২.০৫ বিলিয়ন ডলার
ওমান ২.০৪ বিলিয়ন ডলার
কুয়েত ১.৭৬ বিলিয়ন ডলার
পরিসংখ্যান বলছে, সৌদি আরব এখন বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় উৎস। তবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোর অবদানও উল্লেখযোগ্য।
এ থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের ভিত্তি শুধু মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর নয়; বরং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিরা সম্মিলিতভাবে এই অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছেন।
বদলে যাচ্ছে লাখো পরিবারের জীবন
রেমিট্যান্সের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে প্রবাসীদের পরিবারে। একজন প্রবাসী মাস শেষে যে অর্থ দেশে পাঠান, তা দিয়ে কোনো পরিবার সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালায়, কেউ চিকিৎসা করায়, কেউ বাড়ি নির্মাণ করে, আবার কেউ জমি কিনে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
গ্রামের অনেক পরিবারে প্রবাসী আয়ের অর্থেই তৈরি হয়েছে পাকা বাড়ি, গড়ে উঠেছে ছোট ব্যবসা, বেড়েছে শিক্ষার সুযোগ। অনেক ক্ষেত্রে কৃষিজমি কেনা, গবাদিপশু পালন, দোকান কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনেও রয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের প্রবাসী পরিবারের ওপর রেমিট্যান্সের প্রভাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রবাসী আয় পাওয়া পরিবারগুলোর আয়, ব্যয়, সঞ্চয়, জমির মালিকানা ও বিনিয়োগের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। দারিদ্র্য কমাতেও এর ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে।
অর্থাৎ রেমিট্যান্স শুধু পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটায় না, অনেক ক্ষেত্রে একটি পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার পথও তৈরি করে।
রেমিট্যান্স বাড়লেও কমছে বিদেশে কর্মসংস্থানের গতি
এখানেই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা রয়েছে।
একদিকে রেমিট্যান্স বাড়ছে, অন্যদিকে বিদেশে নতুন কর্মসংস্থানের গতি কমছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ ৬৯ হাজার বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৫ শতাংশ কম।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, শ্রমবাজারের অনিশ্চয়তা এবং কয়েকটি দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এখানে একটি অর্থনৈতিক বিষয় বোঝা জরুরি। চলতি বছরে বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমলেও আগের বছরগুলোতে যাওয়া লাখ লাখ কর্মী এখনো বিদেশে কাজ করছেন। তাঁদের পাঠানো অর্থের কারণেই নতুন কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমার পরও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে নতুন কর্মসংস্থান কমতে থাকলে ভবিষ্যতে প্রবাসী আয়ের ওপর তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে শুধু বেশি কর্মী বিদেশে পাঠানো নয়, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এখন সময়ের দাবি।
হুন্ডি বন্ধ না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি
রেমিট্যান্সের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা।
অনেক প্রবাসী বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠান। এর ফলে প্রবাসীর পরিবার টাকা পেলেও সেই অর্থ দেশের আনুষ্ঠানিক বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে যুক্ত হয় না।
ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রত্যাশিত ডলার যোগ হয় না, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহ কমে এবং বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা, দ্রুত অর্থ পৌঁছানো, প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার নিশ্চিত করা এবং প্রণোদনা দেওয়া হলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীরা আরও উৎসাহিত হন।
সরকারের জন্য তাই হুন্ডি প্রতিরোধের পাশাপাশি বৈধ চ্যানেলকে আরও সহজ, সাশ্রয়ী ও প্রবাসীবান্ধব করা জরুরি।
প্রবাসীদের আয়ের পেছনে রয়েছে বড় ত্যাগ ও ঝুঁকি
অর্থনীতির পরিসংখ্যানে রেমিট্যান্সের অঙ্ক দেখা গেলেও এর পেছনের মানবিক গল্প অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।
একজন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন কিংবা পরিবারের শেষ সম্বলটুকু ব্যয় করেন। এরপর বিদেশে গিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হয়।
বাংলাদেশে বিদেশে কর্মী পাঠানোর উচ্চ ব্যয়, দালালের প্রতারণা, ভুয়া ভিসা, চুক্তি অনুযায়ী বেতন না পাওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা দীর্ঘদিনের সমস্যা।
বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যয় নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক কর্মী বিদেশে যাওয়ার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। ফলে বিদেশে গিয়ে প্রথম কয়েক মাসের উপার্জনের বড় অংশই চলে যায় ঋণ পরিশোধে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবার থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা, সন্তানদের বেড়ে ওঠার সময় পাশে থাকতে না পারা এবং বিদেশে একাকিত্বের মতো সামাজিক ও মানসিক চাপ।
২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অভিবাসনের সামাজিক ব্যয়বিষয়ক এক গবেষণায়ও কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ এবং দেশে রেখে যাওয়া নারী ও প্রবীণ সদস্যদের বাড়তি দায়িত্বের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
রেমিট্যান্সকে বিনিয়োগে রূপান্তর করতে হবে
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নয়, বরং এই অর্থকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করার মধ্যে।
বর্তমানে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয় পরিবারের ভোগ, বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা, চিকিৎসা ও শিক্ষার পেছনে। এগুলো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা তৈরির সুযোগ আরও বাড়ানো সম্ভব।
এ জন্য কয়েকটি উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—
– প্রবাসীদের জন্য সহজ শর্তে বিনিয়োগ ও সঞ্চয় সুবিধা চালু করা।
– প্রবাসী আয় দিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তুলতে উৎসাহ দেওয়া।
– প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ ও আকর্ষণীয় বন্ড এবং বিনিয়োগ পণ্য সম্প্রসারণ।
– বিদেশফেরত কর্মীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।
– বিদেশে যাওয়ার আগে দক্ষতা উন্নয়ন ও ভাষা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
– নতুন নতুন দেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা।
এতে রেমিট্যান্স শুধু পরিবারের ভোগব্যয় নয়, দেশের কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতেও অবদান রাখতে পারবে।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অর্থনীতি রেমিট্যান্সের ওপর যতটা নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এই আয়ের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা শ্রমবাজারে পরিবর্তন ঘটলে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও আয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে বাংলাদেশের শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক হওয়ায় ওই অঞ্চলের অস্থিরতা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ওমানের পাশাপাশি ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় দেশে দক্ষ কর্মীদের কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ব্যয় কমানো, দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ, বেতন ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং বিপদে পড়া প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রবাসীরা শুধু ডলার পাঠান না, বাঁচিয়ে রাখেন অর্থনীতির সম্ভাবনা
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান এখন আর শুধু পরিবারের আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁদের পাঠানো অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সরবরাহ বাড়াচ্ছে, রিজার্ভ শক্তিশালী করছে, আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়তা করছে এবং লাখো পরিবারকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স তারই বড় প্রমাণ।
কিন্তু এই অর্জনের পেছনে রয়েছে লাখো মানুষের ঘাম, শ্রম, ত্যাগ ও পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার বেদনা। তাই প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যম হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সবচেয়ে বড় কথা, রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে সাময়িকভাবে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য এই অর্থকে উৎপাদন, শিল্প ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করতে হবে।



