প্রবাস

প্রবাসী হঠাৎ নিখোঁজ? কোথায় খুঁজবেন, কীভাবে সাহায্য পাবে পরিবার?

বিদেশে কর্মরত কোনো বাংলাদেশির সঙ্গে হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা তিনি দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, নির্যাতন বা আটকের শিকার হলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন স্বজনরা।

অনেক সময় কোথায় খোঁজ নিতে হবে, কার কাছে অভিযোগ জানাতে হবে কিংবা দূতাবাস কী ধরনের সহায়তা দিতে পারে এসব না জানার কারণে পরিবারকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়।

তবে এমন পরিস্থিতিতে বসে না থেকে দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশ, বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশন এবং প্রবাসী কল্যাণ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান, আইনি সহায়তা কিংবা জরুরি সহযোগিতা পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব।

প্রবাসী স্বজনের ফোন বন্ধ পাওয়া গেলে বা দীর্ঘ সময় কোনো খোঁজ না মিললে প্রথমে তাঁর কর্মস্থল, নিয়োগকর্তা, বাসার সহকর্মী, বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। সর্বশেষ কখন কথা হয়েছে, কোথা থেকে ফোন করেছিলেন এবং কোথায় যাওয়ার কথা ছিল এসব তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি।

যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো তথ্য না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশের কাছে নিখোঁজের অভিযোগ জানাতে হবে। নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান, সম্ভাব্য যাতায়াতের স্থান বা শেষ যোগাযোগের তথ্য পুলিশকে দিতে হবে।

পরিস্থিতি সন্দেহজনক হলে বা জীবনহানির আশঙ্কা থাকলে এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়।

নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পেতে সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের কনস্যুলার বিভাগ কিংবা শ্রমকল্যাণ উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

দূতাবাসের জরুরি নম্বর, ই-মেইল ও যোগাযোগের ঠিকানা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা যায়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, প্রবাসে নিখোঁজ বাংলাদেশি নাগরিকের সন্ধান পেতে পরিবারের সদস্যরা লিখিত আবেদন করতে পারেন।

এ আবেদনের সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তির পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, নিয়োগপত্র বা ইকামার কপি (যদি থাকে) জমা দিতে হয়।

এ ছাড়া আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের কপি, পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দিতে হবে। নিখোঁজ ব্যক্তির সর্বশেষ অবস্থান, মোবাইল নম্বর এবং ফেসবুক আইডির মতো তথ্যও আবেদনে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।

আবেদনটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (কনস্যুলার ও কল্যাণ) বরাবর লিখে রুম নম্বর ৩০২, কনস্যুলার ভবনে জমা দেওয়া যায়। অনলাইনে aswelfare@mofa.gov.bd ঠিকানায়ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো যায়।
মন্ত্রণালয়ের সেবা সনদে এ ধরনের আবেদন বিনামূল্যে গ্রহণ এবং এক কর্মদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে পত্র পাঠানোর কথা উল্লেখ রয়েছে।

তবে এটি দূতাবাসে আবেদন পাঠানোর সময়সীমা; নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়ার নিশ্চয়তা বা নির্দিষ্ট সময়সীমা নয়।

বিদেশে থাকা কর্মী কিংবা বাংলাদেশে অবস্থানরত তাঁর পরিবারের সদস্যরা প্রবাসী কল সেন্টারের মাধ্যমে সহায়তা ও তথ্য চাইতে পারেন।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা এই কল সেন্টারের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ করতে পারেন।

প্রবাসী কল সেন্টার নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে এবং কীভাবে সহায়তা চাইতে হবে, সে বিষয়ে তথ্য দিতে পারে।

কোনো প্রবাসী বিদেশে আটক বা গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে খবর পেলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশ, কারা কর্তৃপক্ষ বা ইমিগ্রেশন বিভাগের মাধ্যমে তাঁর অবস্থান ও আটকের কারণ জানার চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসকে বিষয়টি জানাতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেবা সনদে বিদেশের কারাগার ও ডিটেনশন সেন্টারে আটক বাংলাদেশিদের আইনি পরামর্শ ও তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

এ জন্য পরিবারের সদস্যদের লিখিত আবেদন, আটক ব্যক্তির পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, আবেদনকারীর পরিচয়পত্র এবং নিয়োগপত্র বা ইকামার কপি (যদি থাকে) জমা দিতে হয়।

মন্ত্রণালয় বিনামূল্যে এক কর্মদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে পত্র পাঠানোর কথা জানিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ বিএমইটি কার্ড ছাড়া কোন শ্রমিক বিদেশে যেতে পারবেন, জানুন নিয়ম

দূতাবাস আটক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, তাঁর অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় আইন অনুযায়ী আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারে।

তবে দূতাবাস বিদেশি আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে না কিংবা কাউকে মুক্তি দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

প্রবাসী কোনো কর্মী দুর্ঘটনায় আহত, গুরুতর অসুস্থ কিংবা নির্যাতনের শিকার হলে তাঁর পরিবারকে দ্রুত সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ মিশন এবং স্থানীয় জরুরি সেবা বা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

হাসপাতালের নাম, চিকিৎসার অবস্থা, ঘটনার স্থান এবং নিয়োগকর্তার তথ্য সংগ্রহ করে দূতাবাসকে জানানো জরুরি।

নির্যাতন, মানবপাচার বা জোরপূর্বক আটকে রাখার অভিযোগ থাকলে বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। প্রয়োজনে নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা কিংবা দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা চাইতে পারেন।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের আইনগত দায়িত্বের মধ্যেও বিপদগ্রস্ত, অসুস্থ, আহত বা নির্যাতনের শিকার প্রবাসী কর্মীদের উদ্ধার, দেশে ফেরানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনি ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার বিষয় রয়েছে।

প্রবাসী স্বজনের বিপদের সময় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পরিবারের কাছে তাঁর প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথির কপি সংরক্ষিত থাকা উচিত। যেমন-

১. পাসপোর্ট নম্বর ও পাসপোর্টের কপি।

২. ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট বা ইকামার কপি।

৩. বিএমইটি ছাড়পত্র বা স্মার্ট কার্ডের তথ্য (যদি থাকে)।

৪. নিয়োগকর্তা ও কোম্পানির নাম, ঠিকানা এবং যোগাযোগ নম্বর।

৫. কর্মস্থল ও আবাসস্থলের ঠিকানা।

৬. বিদেশের মোবাইল নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি এবং পরিবারের সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগের সময়।

৭. বিমানের টিকিট, যাত্রার তারিখ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচিতজনের তথ্য।

এসব তথ্য এক জায়গায় সংরক্ষণ করলে প্রয়োজনে পুলিশ, দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত তথ্য দেওয়া সম্ভব হবে।

নিখোঁজ বা বিপদে পড়া ব্যক্তিকে খুঁজে দেওয়ার কথা বলে কেউ অর্থ দাবি করলে যাচাই ছাড়া টাকা দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তি বা দালালের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস, পুলিশ ও সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তির পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র, ব্যক্তিগত ছবি বা পরিবারের আর্থিক তথ্য অপরিচিত কারও কাছে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

প্রবাসে কেউ নিখোঁজ হলে বা বিপদে পড়লে পরিবারের প্রথম কাজ হলো সর্বশেষ অবস্থান ও যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানো এবং দ্রুত বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনকে অবহিত করা। প্রয়োজনে বাংলাদেশের প্রবাসী কল সেন্টার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নিতে হবে।

সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় নথি এবং দ্রুত যোগাযোগ—এই ৩ নটি বিষয় সংকটের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জরুরি যোগাযোগের তথ্য

প্রবাসী কল সেন্টার
১৬১৩৫
বাংলাদেশ থেকে টোল ফ্রি

বিদেশ থেকে: +৮৮০ ৯৬১০ ১০২ ০৩০

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে সহায়তা
ই-মেইল: aswelfare@mofa.gov.bd

ঠিকানা: রুম ৩০২, কনস্যুলার ভবন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা।

 

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button