
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। ইরান যুদ্ধ, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং এল নিনোর প্রভাবে পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বিশ্ববাজারে সামগ্রিক পণ্যমূল্য ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে শস্য সরবরাহে বিঘ্ন, এল নিনোর তীব্র প্রভাব এবং জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্যের কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে খাদ্যপণ্যের দাম আরও ৭ শতাংশ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, একই সময়ে পণ্যের বাজারে একাধিক বড় ধরনের অভিঘাত তৈরি হয়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং বাণিজ্যব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এল নিনোর প্রভাবে কৃষি উৎপাদনে ঝুঁকি
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াজনিত ঘটনা। এর প্রভাবে চলতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে এল নিনোর বিরূপ প্রভাব আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, খরা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা কৃষি উৎপাদনকারীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। এতে ফসল উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দামও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়তে পারে ৩২ শতাংশ
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। তবে ইরান ও ইউক্রেনের সংঘাত আরও তীব্র না হলে ২০২৭ সালে জ্বালানির দাম বাড়ার গতি কমে আসতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়। একই সঙ্গে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যব্যবস্থায় চাপ আরও বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, এল নিনোর প্রভাব অত্যন্ত তীব্র হলে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনের জাহাজে হামলা বাড়লে কিংবা ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম আরও বেড়ে গেলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঝুঁকি একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে ২০২৭ সালে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের দাম মূল পূর্বাভাসের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে। এতে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের মূল্যস্তরকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দরিদ্র দেশগুলোর জন্য জরুরি সহায়তা
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে ৮৭০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করাই এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। মহামারির সময় বাদ দিলে চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে তেলের সরবরাহে এটি হবে সবচেয়ে বড় পতন।
তবে চলতি বছর বিশ্বে তেলের ব্যবহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। চাহিদা কমে যাওয়ায় তেলের দাম আরও বেশি বেড়ে যাওয়ার চাপ কিছুটা কমতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারি ও ১৯৮০ সালের তেলসংকটের পর তেলের চাহিদা কমার ক্ষেত্রে এটি হবে তৃতীয় বৃহত্তম পতন।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, খাদ্য, জ্বালানি ও সামগ্রিক পণ্যমূল্য নিয়ে সংস্থাটির বর্তমান পূর্বাভাস গত এপ্রিলে প্রকাশিত পূর্বাভাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা করা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।



