
সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার স্বল্পগতির রিকশা বা ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। এতে ই-রিকশার নিবন্ধন ও নবায়ন ফি, গতিসীমা, যাত্রী বহন, চলাচলের এলাকা, পার্কিং এবং ব্যাটারি চার্জিংয়ের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিবন্ধন ছাড়া গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও নিষিদ্ধ সড়কে চলাচলসহ বিভিন্ন কাজকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে। ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ শিরোনামে জারি করা বিধিমালাটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
নিবন্ধন ও নবায়ন ফি
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা। এর বার্ষিক নবায়ন ফি ৪ হাজার টাকা। চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা। সব ধরনের ই-রিকশার ফিটনেস সনদের জন্য দিতে হবে ১ হাজার টাকা।
নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, দুই কপি সত্যায়িত পাসপোর্ট আকারের ছবি, নিবন্ধন ফি জমার রসিদ এবং নির্ধারিত ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে। আবেদন যাচাই করে কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হলে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেবে।
কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর, নম্বর প্লেট ও বিস্তারিত তথ্যসংবলিত ব্লু-বুক দেওয়া হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন করা যাবে। তবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানো যাবে না।
গতিসীমা ও যাত্রী বহনে বিধিনিষেধ
বিধিমালায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় এ সীমা হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার।
ই-রিকশার আকার অনুযায়ী চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। যাত্রীদের হাতে বহনযোগ্য ব্যক্তিগত মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা নিষিদ্ধ। এ ছাড়া ই-রিকশার হর্নের শব্দের তীব্রতা ৪০ ডেসিবেলের বেশি হতে পারবে না।
ই-রিকশা জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করিডোর, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সড়ক ও ফুটপাতে চলাচল করতে পারবে না। চালকদের সড়কের বাম পাশের লেন অনুসরণ করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য গাড়িকে অতিক্রম করা এবং অনিয়ম করে লেন পরিবর্তনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
জোনভিত্তিক চলাচল ও পার্কিং
ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে রুট নির্ধারণ করবে। সিটি করপোরেশন এলাকাকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে ই-রিকশার সংখ্যা, চলাচলের সড়ক ও নির্দিষ্ট রং নির্ধারণ করা হবে। এক জোনে চলাচলের অনুমতি পাওয়া ই-রিকশা অন্য জোনে চলতে পারবে না।
এ ছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে বা উপযুক্ত স্থানে ই-রিকশা রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পার্কিং এলাকা নির্ধারণের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
১২ বছর পর বাতিল হবে নিবন্ধন
নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়সীমা শেষ হলে সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নিবন্ধন ও নম্বর প্লেট বাতিল করতে হবে।
প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুসারে গাড়ির নকশা ও ফিটনেস নিশ্চিত করতে হবে। যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না।
ব্যাটারি চার্জিং ও পরিবেশ সুরক্ষা
বিধিমালা অনুযায়ী, ব্যাটারি চার্জ করতে হবে কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত ও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট অথবা নির্ধারিত গ্যারেজে। চার্জিং অবকাঠামোয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
পরিবেশ সুরক্ষায় পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় কিংবা সাধারণ বর্জ্যে ফেলা বা পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় বিক্রেতাকে ক্রেতার কাছ থেকে একটি পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে অনুমোদিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ব্যাটারি ভাঙা বা গলানোর কাজও করা যাবে না।
চালকদের প্রশিক্ষণ ও দুর্ঘটনার পর করণীয়
ই-রিকশাচালকদের ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা এবং ব্যাটারি ও যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে বিধিমালায়।
দুর্ঘটনা ঘটলে চালককে তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ি থামাতে হবে, আহত ব্যক্তিদের সহায়তা করতে হবে এবং পুলিশকে জানাতে হবে।
যেসব কাজ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে
বিধিমালায় নিবন্ধন ছাড়া ই-রিকশা চালানো, নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার, মোটর বা গাড়ির কাঠামো পরিবর্তন এবং নিষিদ্ধ এলাকায় চলাচলকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা এবং দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
ই-রিকশা উৎপাদনেও নিয়ন্ত্রণ
ই-রিকশার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সুপারিশ দিতে একটি কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী যাচাই-বাছাইয়ের পর সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে উৎপাদন লাইসেন্স দেওয়া হবে।
নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর জারি করা ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৫’ রহিত করা হয়েছে।



