
ঘুমের মধ্যে মুখ খোলা রেখে শ্বাস নেওয়া অনেকেরই সাধারণ অভ্যাস। বিশেষ করে সর্দি বা নাক বন্ধ থাকলে এমনটা হতে পারে। ঘুম থেকে ওঠার পর স্বাভাবিক বোধ করলে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায় না। তবে নিয়মিত মুখ খোলা রেখে ঘুমানোর অভ্যাস মুখের আর্দ্রতা, দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্য এবং ঘুমের মানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি, এটি নাক বন্ধ থাকা, অ্যালার্জি কিংবা ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসের কোনো সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। তাই অভ্যাসটি কেন হচ্ছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি।
মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেয়ে নাক দিয়ে নেওয়া ভালো কেন?
ফুসফুসে পৌঁছানোর আগে নাক বাতাসকে পরিশোধন, উষ্ণ ও আর্দ্র করতে সাহায্য করে। নাকের ভেতরের গঠন ধুলাবালু ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র কণা আটকে রাখে। পাশাপাশি, নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সময় তৈরি হওয়া নাইট্রিক অক্সাইড নামের একটি গ্যাস রক্তনালির প্রসারণ ও শরীরে অক্সিজেন ব্যবহারে ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সময় বাতাসের পরিশোধন, উষ্ণতা ও আর্দ্রতা নিশ্চিত করার এই প্রক্রিয়ার কিছু অংশ এড়িয়ে যায়। ফলে তুলনামূলক শীতল ও শুষ্ক বাতাস সরাসরি মুখ ও গলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
সর্দির কারণে সাময়িকভাবে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হলে সাধারণত তা ক্ষতিকর নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে বা নিয়মিত মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস থাকলে নাক বন্ধ থাকা, অ্যালার্জি কিংবা শ্বাসপ্রশ্বাসের পথের কোনো সমস্যার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মুখ খোলা রেখে ঘুমালে কী কী সমস্যা হতে পারে?
ঘুমের সময় মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার প্রভাব পড়তে পারে মুখ, গলা ও ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়। এর ফলে কয়েক ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া: মুখ দিয়ে সারারাত বাতাস চলাচল করলে মুখ ও গলার ভেতরের টিস্যু শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর মুখ শুকিয়ে থাকা বা গলায় ব্যথা ও অস্বস্তি হতে পারে।
মুখে দুর্গন্ধ: লালা মুখের খাবারের অবশিষ্টাংশ ও ব্যাকটেরিয়া পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। মুখ শুকিয়ে গেলে লালার পরিমাণ বা কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। এতে মুখে দুর্গন্ধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির সমস্যা: দাঁত ও মুখের ভেতরের টিস্যু সুরক্ষায় লালার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মুখের আর্দ্রতা কমে গেলে দাঁতের ক্ষয়, মাড়িতে প্রদাহ এবং মাড়ি থেকে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ঠোঁট ফেটে যাওয়া ও জিহ্বায় আস্তরণ: দীর্ঘ সময় মুখ শুকিয়ে থাকার কারণে ঠোঁট ফেটে যেতে পারে। জিহ্বার ওপরও আস্তরণ জমতে পারে।
নাক ডাকা ও ঘুমের ব্যাঘাত: শ্বাসপ্রশ্বাসের পথ সরু হয়ে যাওয়া এবং মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাসের মধ্যে সম্পর্ক থাকতে পারে। এ কারণে নাক ডাকা ও ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
২০২২ সালে পলিমারস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় মুখের আর্দ্রতা কমে যাওয়ার সঙ্গে দাঁতের ক্ষয় ও মুখের সংক্রমণের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। মুখ শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া এ সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া কি ঘুমের মান খারাপ করে?
শ্বাসপ্রশ্বাসের পথের কোনো সমস্যা থাকলে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ফলে রাতে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও দিনের বেলায় ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভূত হতে পারে।
এর সম্ভাব্য একটি কারণ হলো অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া। এটি এমন একটি ঘুমজনিত সমস্যা, যাতে ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসের ওপরের পথ বারবার সরু হয়ে যায় বা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হয় এবং ঘুমের মধ্যে বারবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে হাঁপিয়ে ওঠা, সকালে মাথাব্যথা এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব এ সমস্যার সতর্কতামূলক লক্ষণ হতে পারে।
আমেরিকান থোরাসিক সোসাইটির একটি পর্যালোচনায় স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে শুধু মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস থাকলেই কারও স্লিপ অ্যাপনিয়া রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার ইতিহাসও বিবেচনা করতে হয়।
বিশেষ করে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার পাশাপাশি জোরে নাক ডাকা বা ঘুমের মধ্যে হাঁপিয়ে ওঠার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। ঘুমের ব্যাঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তা মনোযোগ, মেজাজ এবং দিনের বেলার কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। এমন লক্ষণ নিয়মিত দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।



