
অস্ত্রোপচারের আগে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাবার ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বলেন চিকিৎসকেরা। বিশেষ করে সকালে অস্ত্রোপচার নির্ধারিত থাকলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা রোগীর জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। তবে এটি কেবল হাসপাতালের নিয়ম নয়। অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার সময় গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কমাতেই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর অন্যতম কারণ হলো পাকস্থলীর খাবার বা তরল শ্বাসনালি হয়ে ফুসফুসে প্রবেশের আশঙ্কা।
সাধারণভাবে অস্ত্রোপচারের অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে থেকে খাবার গ্রহণ বন্ধ রাখতে বলা হতে পারে। তবে কতক্ষণ উপবাস করতে হবে, তা নির্ভর করে খাবারের ধরন, অস্ত্রোপচারের পদ্ধতি, অ্যানেস্থেসিয়ার ধরন এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর। তাই অস্ত্রোপচারের আগে কেন না খেয়ে থাকতে হয় এবং এ ক্ষেত্রে কী কী বিষয় মনে রাখা জরুরি, তা জানা প্রয়োজন।
অস্ত্রোপচারের আগে না খেয়ে থাকতে হয় কেন?
অস্ত্রোপচারের আগে উপবাসের প্রধান উদ্দেশ্য হলো পালমোনারি অ্যাসপিরেশন বা পাকস্থলীর খাবার, তরল কিংবা অন্যান্য উপাদান শ্বাসনালি দিয়ে ফুসফুসে প্রবেশের ঝুঁকি কমানো।
স্বাভাবিক অবস্থায় শরীরের কিছু প্রতিরক্ষামূলক প্রতিবর্ত ক্রিয়া থাকে। কাশি দেওয়া ও ঢোক গেলার মতো এসব ক্রিয়া খাবার এবং তরলকে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। কিন্তু জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়া বা সাধারণ অবেদন প্রয়োগের ফলে রোগী অচেতন হয়ে পড়েন এবং এসব প্রতিরক্ষামূলক ক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়।
এ ছাড়া অ্যানেস্থেসিয়ার ওষুধ শরীরের এমন কিছু পেশি শিথিল করতে পারে, যেগুলো সাধারণত পাকস্থলীর উপাদানকে খাদ্যনালিতে উল্টো দিকে উঠে আসা থেকে বাধা দেয়। ফলে পাকস্থলীতে খাবার বা তরল থাকলে তা শ্বাসনালি হয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করার আশঙ্কা তৈরি হয়।
‘গ্ল্যান্ড সার্জারি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, পাকস্থলীর উপাদান ফুসফুসে প্রবেশ করলে প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট এবং গুরুতর ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার আগে পাকস্থলী যথেষ্ট খালি রাখলে এ ধরনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
অ্যানেস্থেসিয়ার সময় পাকস্থলীতে কী ঘটে?
খাবার গ্রহণের পর তা পাকস্থলীতে কিছু সময় থাকে। এরপর ধীরে ধীরে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করে। পাকস্থলী খালি হতে কতক্ষণ লাগবে, তা নির্ভর করে খাবারের পরিমাণ ও ধরনের ওপর।
সাধারণত কঠিন খাবার পাকস্থলী থেকে বের হতে স্বচ্ছ তরলের তুলনায় বেশি সময় নেয়। বিশেষ করে চর্বিযুক্ত খাবার হজম হতে এবং পাকস্থলী থেকে বের হতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগতে পারে। তাই অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার সময় পাকস্থলী ভরা থাকলে খাবার বা তরল উল্টো দিকে উঠে আসার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়ার সময় রোগী সচেতন অবস্থার মতো নির্ভরযোগ্যভাবে নিজের শ্বাসনালি সুরক্ষিত রাখতে পারেন না। এ সময় অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞরা শ্বাসনালি সুরক্ষিত রাখতে এবং খাবার বা তরল ফুসফুসে প্রবেশের ঝুঁকি সামলাতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেন। তবে এসব ব্যবস্থার পরও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা যায় না।
এ কারণেই অস্ত্রোপচারের আগে নির্দিষ্ট সময় খাবার ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকা অ্যানেস্থেসিয়ার নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কেন সাধারণত ছয় ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে বলা হয়?
অস্ত্রোপচারের আগে ছয় ঘণ্টা উপবাসের নির্দেশনা সব রোগীর জন্য একইভাবে প্রযোজ্য নয়। খাবারের ধরন অনুযায়ী উপবাসের সময়ও ভিন্ন হতে পারে।
ইউরোপীয় অ্যানেস্থেসিওলজি ও নিবিড় পরিচর্যা চিকিৎসা সমিতির নির্দেশনা অনুযায়ী, পরিকল্পিত অস্ত্রোপচার হতে যাচ্ছে এমন অনেক সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে সাধারণত খাবার ও পানীয় গ্রহণের সময়সীমা আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়।
স্বচ্ছ তরল: হাসপাতালের নির্দেশনা ও রোগীর অবস্থা অনুযায়ী, অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার দুই ঘণ্টা আগ পর্যন্ত পানি, শাঁসবিহীন ফলের রস এবং দুধ ছাড়া কালো চা বা কফির মতো স্বচ্ছ তরল পান করার অনুমতি থাকতে পারে।
হালকা খাবার: এ ধরনের খাবার গ্রহণের পর সাধারণত অন্তত ছয় ঘণ্টা বিরতি প্রয়োজন হয়।
ভারী বা চর্বিযুক্ত খাবার: এসব খাবারের ক্ষেত্রে আট ঘণ্টা বা তার বেশি সময় বিরতির প্রয়োজন হতে পারে। কারণ, চর্বি পাকস্থলী খালি হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
তবে এগুলো সাধারণ নির্দেশনা। রোগীর শারীরিক অবস্থা, অস্ত্রোপচারের ধরন এবং হাসপাতালের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী সময়সীমা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই রোগীদের নিজেদের সিদ্ধান্তে খাবার বা পানীয় গ্রহণ বন্ধ কিংবা শুরু না করে অস্ত্রোপচার ও অ্যানেস্থেসিয়া দলের দেওয়া নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
অস্ত্রোপচারের আগে কিছু খেলে বা পান করলে কী হতে পারে?
চিকিৎসকের নির্দেশনা অমান্য করে অস্ত্রোপচারের আগে খাবার বা পানীয় গ্রহণ করলে অ্যানেস্থেসিয়ার সময় পাকস্থলীর উপাদান শ্বাসনালি হয়ে ফুসফুসে প্রবেশের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ যদি মনে করেন যে রোগীর পাকস্থলী যথেষ্ট খালি হয়নি, তাহলে অস্ত্রোপচার পিছিয়ে দেওয়া বা নতুন সময় নির্ধারণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে অস্ত্রোপচারের আগে ভুল করে কিছু খাওয়া বা পান করলেই যে প্রত্যেক রোগীর জটিলতা হবে, তা নয়। রোগীর অবস্থা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করে চিকিৎসকেরা পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করেন।
এ ক্ষেত্রে রোগীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভুলবশত কিছু খেয়ে বা পান করে ফেললে তা চিকিৎসকদের জানানো। কী খাওয়া হয়েছে, কতটুকু খাওয়া হয়েছে এবং কখন খাওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে অ্যানেস্থেসিয়া দল ঝুঁকি মূল্যায়ন করে নিরাপদে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
অল্প পরিমাণ খাবার, দুধ বা অন্য কোনো পানীয় গ্রহণ করলেও তা অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিষয়টি গোপন না করে চিকিৎসককে জানানো এবং তাঁর নির্দেশনা মেনে চলাই নিরাপদ।



