
বাংলাদেশের বেশির ভাগ পরিবারের প্রতিদিনের খাবারে ডাল থাকে। মসুর, মুগ ও খেসারিসহ নানা ধরনের ডাল সহজলভ্য এবং প্রোটিন, খাদ্য আঁশ ও বিভিন্ন খনিজ উপাদানের উৎস। নিয়মিত খাবারের তালিকায় ডাল রাখলে পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা হতে পারে। তবে ডাল কীভাবে পরিষ্কার, ভিজিয়ে ও রান্না করা হচ্ছে, তার ওপরও এর পুষ্টিমান ও হজমযোগ্যতা কিছুটা নির্ভর করে।
ডাল থেকে পুষ্টি পেতে কিছু সহজ অভ্যাস অনুসরণ করা যায়। তবে ভেজানো বা রান্নার কোনো একটি পদ্ধতিই সব পুষ্টি উপাদান ধরে রাখার নিশ্চয়তা দেয় না।
ডাল ভিজিয়ে রাখুন
রান্নার আগে ডাল ভিজিয়ে রাখলে তা দ্রুত সেদ্ধ হয়। পাশাপাশি, ভিজিয়ে রাখার ফলে কিছু ডালে থাকা ফাইটেটের মতো উপাদানের পরিমাণ কমতে পারে। ফাইটেট শরীরে আয়রন ও জিঙ্কের মতো কিছু খনিজ উপাদান শোষণে বাধা দিতে পারে। তবে শুধু দুই ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলেই সব ফাইটেট বা অন্যান্য পুষ্টি শোষণে বাধা দেওয়া উপাদান দূর হয়ে যায়, এমন নয়। ডালের ধরন ও ভিজিয়ে রাখার সময়ের ওপর এর প্রভাব নির্ভর করে।
ভেজানো পানি ফেলে দেবেন কি না
ডাল ভেজানোর পর সেই পানি ফেলে দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন থাকে। ভেজানো পানিতে ডাল থেকে কিছু পানিতে দ্রবণীয় উপাদান বেরিয়ে আসতে পারে। তবে ভিটামিন বি ও ভিটামিন সি-এর মতো পুষ্টি উপাদান ডাল ভেজানোর পানিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চলে যায় এবং পানি ফেলে দিলে সেগুলোও হারিয়ে যায়, এমন দাবি সব ধরনের ডালের ক্ষেত্রে সঠিক নয়। ডালে ভিটামিন সি সাধারণত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে থাকে না।
ডাল ভিজিয়ে রাখার পর পানি ফেলে দিলে কিছু উপাদান দূর হতে পারে। আবার সেই পানি ব্যবহার করলে সেগুলোর কিছু অংশ রান্নার খাবারে থেকে যেতে পারে। তবে ডালের ধরন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং হজমের সুবিধা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ডাল ভেজানোর পানি অপরিষ্কার হয়ে গেলে তা ব্যবহার না করাই ভালো।
ডাল ভেজানোর আগে পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। দুই থেকে তিনবার ধুলে ধুলাবালু ও অন্যান্য দৃশ্যমান ময়লা দূর করতে সুবিধা হয়। এরপর পরিষ্কার পানিতে ডাল ভিজিয়ে রাখুন। ভেজানোর সময় দীর্ঘ হলে, বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায়, ডাল ফ্রিজে রাখলে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে।
ডালের পুষ্টিগুণ পেতে আরও যা করবেন
১. ডালের ধরন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ দেখুন
ডাল কেনার সময় পরিষ্কার, অক্ষত এবং মানসম্মত ডাল বেছে নিন। চকচকে দেখালেই ডাল কৃত্রিমভাবে পালিশ করা বা পুষ্টিহীন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তবে ডালের ওপর অস্বাভাবিক আবরণ, ময়লা বা অন্য কোনো সন্দেহজনক লক্ষণ থাকলে সেটি এড়িয়ে চলুন। ডালের খোসা ছাড়ানো বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে কিছু উপাদানের পরিমাণ বদলাতে পারে, কিন্তু পুষ্টিমান নির্ভর করে ডালের ধরন ও প্রক্রিয়াকরণের ওপর।
২. মান ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিন
ডাল কেনার সময় পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা বা প্রতিষ্ঠানের পণ্য বেছে নিন। প্যাকেটজাত ডালের ক্ষেত্রে মেয়াদ, প্যাকেটের অক্ষত অবস্থা এবং পণ্যের তথ্য দেখে নেওয়া ভালো। ডালে প্রোটিনের পাশাপাশি খাদ্য আঁশ, আয়রন, ফোলেট ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকতে পারে। তবে সব ডালের পুষ্টি উপাদান এক রকম নয়।
৩. বিভিন্ন ধরনের ডাল খেতে পারেন
প্রতিদিন একই ধরনের ডাল না খেয়ে মসুর, মুগ, ছোলা বা অন্যান্য ডাল পালা করে খেতে পারেন। বিভিন্ন ডালে প্রোটিন, খাদ্য আঁশ ও খনিজ উপাদানের পরিমাণে পার্থক্য থাকে। তাই একাধিক ধরনের ডাল খেলে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আসে। তবে সব ডাল একসঙ্গে মেশাতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
৪. ডাল দিয়ে তৈরি করুন নানা পদ
শুধু ডাল-ভাত নয়, ডাল দিয়ে আরও অনেক পদ তৈরি করা যায়। সেদ্ধ ডাল দিয়ে সালাদ, ডালের বড়া, প্যানকেকের মতো নাশতা কিংবা ডালের আটা দিয়ে রুটি তৈরি করা যায়। এসব খাবার তৈরির সময় অতিরিক্ত তেল ও লবণ ব্যবহার না করলে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা সহজ হয়।
প্রতিদিনের খাবারে ডাল রাখা পুষ্টির জোগান বাড়ানোর একটি সহজ উপায়। রান্নার আগে ডাল ভালোভাবে পরিষ্কার করা, প্রয়োজনমতো ভিজিয়ে রাখা এবং পুরোপুরি সেদ্ধ করে খাওয়ার দিকে নজর দিন। ডালের সঙ্গে শাকসবজি, শস্য ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখলে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য বাড়বে।



