বিদেশের কারাগারে বন্দী প্রবাসী বাংলাদেশিদের অজানা জীবনযাপন

বিদেশে কাজ করতে গিয়ে কিংবা ভ্রমণের সময় কোনো আইনি জটিলতায় গ্রেপ্তার হলে একজন প্রবাসীর জীবন মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে।
পরিচিত পরিবেশ, পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁকে থাকতে হয় অন্য দেশের কারাগার বা ডিটেনশন সেন্টারে।
ভাষা না জানা, স্থানীয় আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা-সব মিলিয়ে বন্দিজীবন অনেকের জন্য হয়ে ওঠে কঠিন অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাত দিয়ে জানা যায়, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারে ১৫ হাজার ২১৩ জন বাংলাদেশি আটক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সৌদি আরবের জেদ্দায় ৫ হাজার ৪৮০ জন, মালয়েশিয়ায় ২ হাজার ২১৭ জন এবং ভারতে ১ হাজার ৪৪৪ জন ছিলেন।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ গুরুতর অপরাধের অভিযোগে, আবার কেউ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া বা বৈধ কাগজপত্র না থাকার মতো অভিবাসনসংক্রান্ত কারণে বন্দী রয়েছেন।
তবে বিদেশের সব কারাগারে বন্দীদের জীবনযাপন এক রকম নয়। দেশটির আইন, কারাগারের ধরন, নিরাপত্তাব্যবস্থা, বন্দীর আইনি অবস্থান এবং সুযোগ-সুবিধার ওপর দৈনন্দিন জীবন নির্ভর করে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বন্দীদের খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যায়াম, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে কিছু মৌলিক নির্দেশনা রয়েছে।
কারাগারে সাধারণত নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুসরণ করতে হয়। ঘুম থেকে ওঠা, হাজিরা বা গণনা, খাবার গ্রহণ, নির্ধারিত কাজ কিংবা অন্যান্য কার্যক্রম—সবকিছুই কারা কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
কারাগারভেদে বন্দীদের কাজ, প্রশিক্ষণ, ধর্মীয় কার্যক্রম, পড়াশোনা বা ব্যায়ামের সুযোগ থাকতে পারে। আবার নিরাপত্তা ও জনবলসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে এসব সুযোগ সব প্রতিষ্ঠানে সমানভাবে পাওয়া যায় না।
জাতিসংঘের ‘নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস’ অনুযায়ী, বন্দীদের মানবিক মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার, প্রয়োজনমতো পানীয় জল, পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা এবং আবহাওয়ার উপযোগী পোশাক ও বিছানার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
কারাগারে বন্দীদের খাবারের তালিকা ও পরিবেশ দেশভেদে আলাদা। কোথাও স্থানীয় খাবার দেওয়া হয়, আবার কোথাও ধর্মীয় বা বিশেষ খাদ্যসংক্রান্ত প্রয়োজন বিবেচনায় ব্যবস্থা থাকতে পারে।
তবে বিদেশি বন্দীদের জন্য খাবার সব সময় নিজের দেশের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানানসই নাও হতে পারে।
থাকার ক্ষেত্রেও রয়েছে ভিন্নতা। কোনো কারাগারে একাধিক বন্দীকে একই কক্ষে থাকতে হয়, আবার কোথাও পৃথক থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। কক্ষের জায়গা, আলো-বাতাস, স্যানিটেশন, বিছানা ও পরিচ্ছন্নতার মান কারাগারের অবকাঠামো এবং বন্দীর শ্রেণিবিন্যাসের ওপর নির্ভর করে।
আরও পড়ুনঃ জমি বিক্রি, ঋণের বোঝা—দালালের প্রতারণায় বিদেশযাত্রার স্বপ্নই এখন দুঃস্বপ্ন!
নেলসন ম্যান্ডেলা রুলসে প্রত্যেক বন্দীর জন্য আলাদা বিছানা এবং পরিষ্কার বিছানাপত্রের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদেশের কারাগারে থাকা প্রবাসীদের জন্য চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ কিংবা মানসিক সংকট দেখা দিলে কারা কর্তৃপক্ষের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে চিকিৎসা পাওয়ার কথা।
জাতিসংঘের মানদণ্ডে বলা হয়েছে, বন্দীদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং তাঁদের চিকিৎসার মান সাধারণ জনগণের জন্য উপলব্ধ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও আত্মহানির ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
তবে বাস্তবে চিকিৎসা পাওয়ার সময়, চিকিৎসকের উপস্থিতি, হাসপাতাল নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং ওষুধের প্রাপ্যতা কারাগার ও দেশের ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই সব বন্দী একই ধরনের চিকিৎসাসেবা পান এমন দাবি করা যায় না।
কারাগারে বন্দী প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি হলো পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকা। স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা কিংবা স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে না পারলে তাঁদের উদ্বেগ ও মানসিক চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।
জাতিসংঘের নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস অনুযায়ী, বন্দীদের নিয়মিত বিরতিতে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সঙ্গে চিঠিপত্র, অনুমোদিত টেলিযোগাযোগ বা সাক্ষাতের মাধ্যমে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার কথা। তবে কারাগারের নিরাপত্তা ও স্থানীয় বিধির ভিত্তিতে এসব যোগাযোগ তদারক বা সীমিত হতে পারে।
বিদেশি নাগরিক হিসেবে বন্দীরা তাঁদের দেশের কূটনৈতিক বা কনস্যুলার প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাওয়ার কথাও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উল্লেখ রয়েছে। তবে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরিবারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার নিয়ম এক নয়।
বিদেশের কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য স্থানীয় ভাষা না জানা বড় বাধা হতে পারে। অভিযোগের বিবরণ বোঝা, আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলা, আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বুঝতে অনুবাদকের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
জাতিসংঘের মানদণ্ডে বন্দীদের অভিযোগ ও অধিকার সম্পর্কে তাঁদের বোধগম্য ভাষায় তথ্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় ভাষা বুঝতে না পারলে প্রয়োজন অনুযায়ী দোভাষীর ব্যবস্থা করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
পাশাপাশি আইনজীবীর সঙ্গে গোপনীয়ভাবে পরামর্শ করার সুযোগ এবং কার্যকর আইনি সহায়তার কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগের ধরন অনুযায়ী কারও বিচার চলতে পারে, কেউ সাজা ভোগ করতে পারেন, আবার কেউ অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ডিটেনশন সেন্টারে থাকতে পারেন। ফলে সবার আইনি অবস্থান ও বন্দিত্বের মেয়াদ এক নয়।
বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক কারাগারে আটক থাকার তথ্য পেলে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মিশন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, মামলাসংক্রান্ত পরামর্শ এবং আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নিতে পারে।
সাজা শেষ হওয়া, জরিমানা পরিশোধ, অভিবাসনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়ার পর দেশে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পাসপোর্ট না থাকলে ট্রাভেল পারমিট, বিমানের টিকিট এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নথির ব্যবস্থা করতে দূতাবাস সহায়তা করতে পারে।
তবে সাজা শেষ হলেই সব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফেরা সম্ভব হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বা জরিমানা নিষ্পত্তির প্রয়োজন হতে পারে।
জাতিসংঘের নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস বন্দীদের মানবিক মর্যাদা, স্বাস্থ্যসেবা, খাবার, পরিচ্ছন্নতা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আইনি সহায়তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটিও বন্দীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অধিকার স্বীকৃত থাকলেই সব দেশের প্রতিটি কারাগারে তা সমানভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে এমন নয়।
বিদেশে বন্দী বাংলাদেশিদের প্রকৃত জীবনযাত্রা জানতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের কারা কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ দূতাবাস, বন্দীদের পরিবার এবং কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রবাসে কাজ করতে যাওয়া মানুষের জন্য বিদেশের আইন জানা, বৈধ কাগজপত্র সংরক্ষণ এবং জরুরি অবস্থায় দূতাবাসের যোগাযোগের তথ্য সঙ্গে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বিদেশের কারাগারে একজন প্রবাসীর দিন কেবল বন্দিত্বের সময়সূচিতে সীমাবদ্ধ নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের দুশ্চিন্তা, আইনি অনিশ্চয়তা এবং দেশে ফেরার দীর্ঘ অপেক্ষা।



