বিদেশে চাকরির কথা বলে টাকা নিয়ে উধাও দালাল, কী করবেন এখন?
বিদেশে চাকরির আশায় অনেকেই দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভিসা বা চাকরি না পাওয়া, ভুয়া কাগজপত্র দেওয়া কিংবা বিদেশে গিয়ে চুক্তির সঙ্গে কাজের অমিল—এমন পরিস্থিতিতে পড়লে অনেকেই বুঝতে পারেন না কোথায় অভিযোগ করবেন এবং কীভাবে টাকা ফেরত চাইবেন।
তবে প্রতারণার শিকার হলে টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ করা, লিখিত অভিযোগ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
১. বিএমইটিতে লিখিত অভিযোগ
দালাল বা রিক্রুটিং এজেন্সি বিদেশে পাঠানোর কথা বলে টাকা নিয়ে প্রতারণা করলে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বিএমইটিতে অভিযোগ করা যায়। অভিযোগে এজেন্সির নাম, লাইসেন্স নম্বর (আরএল নম্বর), দালালের পরিচয়, টাকা দেওয়ার তারিখ ও পরিমাণ এবং প্রতারণার বিস্তারিত উল্লেখ করতে হবে।
বিএমইটির অনলাইন অভিযোগ ফরমেও রিক্রুটিং এজেন্সি, অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং অভিযোগের বিবরণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বিএমইটির অনলাইন অভিযোগ ফরম।
২. প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নাগরিক সনদ অনুযায়ী, বিদেশগামী, বিদেশফেরত বা প্রতারণার শিকার কর্মীরা রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। মন্ত্রণালয়ের সেবা বিনামূল্যে। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী তদন্ত ও শুনানির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়+1
৩. বিদেশে থাকলে দূতাবাসে অভিযোগ
কেউ বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হলে সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রম কল্যাণ উইংয়ে লিখিত অভিযোগ করতে পারেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ অভিযোগ জমা দিলে দূতাবাস সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আইনগত সহায়তার বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারে।
প্রতারণার শিকার হলে যেসব প্রমাণ সংগ্রহ করবেন
অভিযোগ করার আগে যতটা সম্ভব প্রমাণ এক জায়গায় গুছিয়ে রাখা জরুরি। যেমন-
- টাকা দেওয়ার রসিদ, ব্যাংক জমার স্লিপ বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের তথ্য।
- দালাল বা এজেন্সির নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর।
- রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নম্বর বা আরএল নম্বর, জানা থাকলে।
- পাসপোর্ট, ভিসা, চাকরির চুক্তিপত্র ও নিয়োগপত্রের কপি।
- দালালের সঙ্গে কথোপকথনের মেসেজ, ই-মেইল ও অন্যান্য যোগাযোগের প্রমাণ।
- টাকা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন—এমন সাক্ষীর নাম ও যোগাযোগের তথ্য।
- প্রতারণার ঘটনার তারিখ, কত টাকা দেওয়া হয়েছে এবং কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার লিখিত বিবরণ।
নগদ টাকা দিলেও অভিযোগ করা সম্ভব। তবে রসিদ বা অন্য কোনো প্রমাণ না থাকলে টাকা লেনদেনের বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হতে পারে। তাই মূল কাগজপত্র নিজের কাছে রেখে অভিযোগের সঙ্গে ফটোকপি বা ডিজিটাল কপি জমা দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩’-এ বিদেশে চাকরির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অর্থ নেওয়া, প্রতারণা করা এবং বৈধ কারণ ছাড়া পাসপোর্ট বা ভিসা আটকে রাখাকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া আইনের ৪১ ধারায় বলা হয়েছে, প্রতারণা, অবৈধভাবে অর্থ গ্রহণ বা কর্মসংস্থান চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি রিক্রুটিং এজেন্টসহ যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারের কাছে অভিযোগ করতে পারবেন।
অভিযোগ পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধান রয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তদন্ত শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে সরাসরি আদেশ বা সালিশের মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইনের ৪৩ ধারা অনুযায়ী, আইন লঙ্ঘন করে নেওয়া অর্থ তদন্তের ভিত্তিতে লিখিত আদেশের মাধ্যমে উদ্ধার করা বা প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণের মামলা করে আদায় করার সুযোগ রয়েছে। উদ্ধার বা আদায় করা অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেওয়া যেতে পারে।
তবে অভিযোগ করলেই পুরো টাকা নিশ্চিতভাবে ফেরত পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তদন্তে প্রতারণা ও অর্থ লেনদেনের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর অর্থ ফেরত পাওয়া নির্ভর করে।
অনেক ক্ষেত্রে দালাল কোনো বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির নাম ব্যবহার করে টাকা সংগ্রহ করেন। এমন পরিস্থিতিতে শুধু দালালের বিরুদ্ধে নয়, সংশ্লিষ্ট এজেন্সির ভূমিকা সম্পর্কেও অভিযোগে উল্লেখ করা উচিত।
আইন অনুযায়ী, রিক্রুটিং এজেন্টের লাইসেন্স বাতিল হলে তার জমা দেওয়া জামানত থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জামানতের অর্থ অপর্যাপ্ত হলে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিকে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া যেতে পারে।
কেউ বিদেশে যাওয়ার পর চাকরি না পাওয়া, চুক্তি অনুযায়ী বেতন না পাওয়া কিংবা নিয়োগসংক্রান্ত প্রতারণার শিকার হলে সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রম কল্যাণ উইংয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমেও আইনগত সহায়তার জন্য আবেদন করা যায়।
প্রবাসী কর্মী নিজে অভিযোগ করতে না পারলে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও দেশে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করে সহায়তা চাইতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কর্মীর পাসপোর্ট, চুক্তিপত্র, লেনদেনের প্রমাণ এবং ঘটনার বিবরণ প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।
কোথায় যোগাযোগ করবেন?
- বিএমইটি: https://bmet.gov.bd
- অনলাইন অভিযোগ: https://employee.oep.gov.bd/employee/complaints/create
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: https://probashi.gov.bd
- ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড: https://wewb.gov.bd
- প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার: ১৬১৩৫ (বাংলাদেশ থেকে টোল ফ্রি); বিদেশ থেকে +৮৮০৯৬১০১০২০৩০।
বিদেশে চাকরির জন্য টাকা দেওয়ার আগে রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধ লাইসেন্স যাচাই করা জরুরি। চাকরির নিয়োগপত্র, ভিসা, বেতন, কাজের ধরন ও অন্যান্য শর্ত ভালোভাবে দেখে নিতে হবে।
প্রতিটি লেনদেনের লিখিত রসিদ নিতে হবে এবং ব্যক্তিগতভাবে দালালের হাতে বড় অঙ্কের টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে কেউ প্রতারণার শিকার হলে চুপ করে না থেকে দ্রুত প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে অভিযোগ করা উচিত। সময়মতো অভিযোগ ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিলে প্রতারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অর্থ উদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।



