বিদেশে দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসার টাকা দেবে কে?
বিদেশে কাজ করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির আঘাত, নির্মাণস্থলে পড়ে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় আহত হলে প্রবাসী কর্মীর চিকিৎসার খরচ কে দেবেন এ নিয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই।
কেউ মনে করেন, সব খরচ নিয়োগকর্তার, আবার কেউ ভাবেন নিজের চিকিৎসার ব্যয় নিজেকেই বহন করতে হবে।
বাস্তবে বিষয়টি নির্ভর করে দুর্ঘটনাটি কর্মক্ষেত্রে ঘটেছে কি না, সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম আইন, কর্মীর স্বাস্থ্য বা দুর্ঘটনা বিমা এবং নিয়োগচুক্তির শর্তের ওপর। তবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সরকারি সহায়তারও ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশের ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩’-এর ২২ ধারা অনুযায়ী, বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে কর্মসংস্থান চুক্তি থাকতে হবে। ওই চুক্তিতে মৃত্যু বা জখমজনিত কারণে কর্মীর প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের বিষয় উল্লেখ করার বিধান রয়েছে।
একই ধারার ২ উপধারা অনুযায়ী, চুক্তিসংক্রান্ত দায়দায়িত্বের ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্ট ও বিদেশি নিয়োগকর্তা যৌথভাবে এবং পৃথকভাবেও দায়ী থাকবেন। অর্থাৎ চুক্তিতে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ বা সংশ্লিষ্ট সুবিধার কথা থাকলে তা আদায়ের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলেই সব দেশে নিয়োগকর্তাকে সব ধরনের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে হবে এমন একক নিয়ম নেই। সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম আইন, কর্মীর বিমা এবং চাকরির চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দায়িত্ব নির্ধারিত হয়।
১. কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে: কর্মস্থলে কাজ করার সময় যন্ত্রপাতির আঘাত, নির্মাণস্থল থেকে পড়ে যাওয়া বা অন্য কোনো পেশাগত দুর্ঘটনায় আহত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম আইন ও কর্মসংস্থান চুক্তি অনুযায়ী নিয়োগকর্তা বা কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা বিমা চিকিৎসা ব্যয় ও ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব নিতে পারে।
২. সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হলে: কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে খরচ কে বহন করবে, তা নির্ভর করবে দুর্ঘটনার পরিস্থিতি, দায়ী পক্ষ, বিমার আওতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের ওপর।
৩. ব্যক্তিগত কারণে অসুস্থ বা আহত হলে: কর্মস্থলের বাইরের ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমা থাকলে তার শর্ত অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যয় বহন করা হতে পারে। বিমা না থাকলে কর্মীকে নিজ খরচে চিকিৎসা নিতে হতে পারে, যদি না নিয়োগকর্তার চুক্তিতে চিকিৎসা সুবিধার নিশ্চয়তা থাকে।
৪. বিমা থাকলে: কর্মীর স্বাস্থ্য বা দুর্ঘটনা বিমা থাকলে পলিসির আওতাভুক্ত চিকিৎসা ব্যয় বিমা প্রতিষ্ঠান বহন করতে পারে। তবে কোন চিকিৎসা, কত টাকা এবং কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া যাবে—এসব বিমার শর্তের ওপর নির্ভর করে।
বিদেশে দুর্ঘটনায় আহত বা অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের চিকিৎসার জন্য ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
বোর্ডের প্রকাশিত সেবা-তথ্য অনুযায়ী, কর্মী নিজে অথবা তাঁর পরিবারের সদস্যরা বোর্ডের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করতে পারেন। আবেদন যাচাই-বাছাই এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে কর্মীর সঙ্গে কথা বলার পর বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে এই সহায়তা দেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে-
- বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র অথবা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সদস্যপদের প্রমাণ।
- কর্মীর পাসপোর্টের কপি।
- চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রের ফটোকপি।
- অসুস্থ বা আহত কর্মীর ছবি।
এ ছাড়া বিদেশে আহত বা অসুস্থ কর্মীকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং বিশেষ ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থায়ও বোর্ড সহায়তা করে। এ জন্য কর্মী বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা যায়। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, দেশে ফেরার পর সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকার চিকিৎসা সহায়তার এই সুবিধা বিদেশে দুর্ঘটনার পরপরই সব চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধের নিশ্চয়তা নয়। এটি বোর্ডের নির্ধারিত শর্ত ও অনুমোদনসাপেক্ষ সহায়তা।
আরও পড়ুনঃ শুধু ভিসা আর টিকিট নয়, বিদেশ যাওয়ার আগে যে প্রশিক্ষণগুলো জরুরি
বিদেশে দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করাও জরুরি। এতে বিমার দাবি, নিয়োগকর্তার কাছে ক্ষতিপূরণ চাওয়া এবং সরকারি সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হয়।
১. দুর্ঘটনার পর দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে।
২. নিয়োগকর্তা বা কোম্পানির দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে দুর্ঘটনার বিষয়টি জানাতে হবে।
৩. কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা হলে প্রতিষ্ঠানের কাছে লিখিত দুর্ঘটনা প্রতিবেদন চাইতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা হলে সম্ভব হলে পুলিশ রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে।
৪. চিকিৎসকের রিপোর্ট, হাসপাতালের ছাড়পত্র, পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজ, ওষুধের বিল এবং চিকিৎসার খরচের রসিদ সংরক্ষণ করতে হবে।
৫. বিমা থাকলে দ্রুত বিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে দাবি জানানোর নিয়ম জেনে নিতে হবে।
৬. নিয়োগকর্তা চিকিৎসার ব্যবস্থা না করলে বা প্রাপ্য সুবিধা দিতে অস্বীকার করলে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রম কল্যাণ উইংয়ে অভিযোগ করতে হবে।
৭. প্রয়োজনে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও প্রবাসী কল্যাণ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করতে হবে।
বিদেশে দুর্ঘটনায় আহত বাংলাদেশি কর্মী বা তাঁর পরিবারের সদস্যরা নিচের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন—
- প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার: বাংলাদেশ থেকে ১৬১৩৫ (টোল ফ্রি)।
- বিদেশ থেকে কল: +৮৮০৯৬১০১০২০৩০।
- ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড: https://wewb.gov.bd
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: https://probashi.gov.bd
- বিএমইটি: https://bmet.gov.bd
বিদেশ যাওয়ার আগে যে বিষয়গুলো যাচাই করবেন
বিদেশে চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে নিয়োগচুক্তিতে চিকিৎসা সুবিধা, স্বাস্থ্যবিমা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ এবং দেশে ফেরার খরচ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জেনে নেওয়া জরুরি।
বিমা থাকলে তার কপি, বিমার মেয়াদ, কোন কোন চিকিৎসা ব্যয় অন্তর্ভুক্ত এবং কীভাবে দাবি করতে হবে—এসব তথ্য নিজের কাছে রাখতে হবে।
বিদেশে দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসার খরচ সব সময় কর্মীকে নিজে বহন করতে হয় না। আবার সব পরিস্থিতিতে নিয়োগকর্তা বা সরকার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করবে এমন নিশ্চয়তাও নেই।
তাই সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, চাকরির চুক্তি, বিমার শর্ত এবং সরকারি কল্যাণ সহায়তা সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকলে বিপদের সময় প্রবাসী কর্মী ও তাঁর পরিবার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবেন।



