কর্মস্থলে প্রবাসীর মৃত্যু হলে পরিবার কী কী ক্ষতিপূরণ পেতে পারে?
বিদেশে পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক প্রবাসী কর্মী কর্মস্থলে দুর্ঘটনা বা অন্য কারণে প্রাণ হারান। তাঁদের মৃত্যুর পর স্বজনদের সামনে একদিকে যেমন শোকের ভার, অন্যদিকে তেমনি আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তবে প্রবাসে কর্মরত কোনো বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবার কয়েকটি খাত থেকে আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
এসবের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক অনুদান, প্রবাসী কর্মী বিমার অর্থ, নিয়োগকর্তার কাছ থেকে মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ, বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা।
তবে কোন পরিবার কত টাকা পাবে, তা নির্ভর করে কর্মীর বৈধ অভিবাসন-সংক্রান্ত কাগজপত্র, বিমার মেয়াদ, মৃত্যুর পরিস্থিতি, চাকরির চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের ওপর।
প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশি কর্মীর পরিবারকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (WEWB) এককালীন ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দিয়ে থাকে। বোর্ডের সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর পরিবারের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে বিইএফটিএনের মাধ্যমে এ অর্থ পাঠানো হয়।
সাধারণত প্রয়োজন হয় পরিবারের সদস্য সনদ, ওয়ারিশ-সংক্রান্ত কাগজপত্র, অর্থ গ্রহণকারীর ব্যাংক হিসাব ও রাউটিং নম্বর, ওয়ারিশদের ছবি এবং নির্ধারিত অঙ্গীকারনামা। বোর্ডের সিটিজেন চার্টারে কাগজপত্র পাওয়ার পর ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে অর্থ দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
বিদেশ থেকে মৃত কর্মীর মরদেহ দেশে আনা হলে বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়।
এ অর্থ মরদেহ গ্রহণকারী পরিবারের সদস্যকে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির পাসপোর্ট, মৃত্যুসনদ, ওয়ারিশ বা পরিবার সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে।
মরদেহ দেশে না এনে সংশ্লিষ্ট দেশেই দাফনের সিদ্ধান্ত হলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীর জন্য প্রযোজ্য প্রবাসী কর্মী বিমা থাকলে মৃত্যুর পর মনোনীত ব্যক্তি বা আইনগত উত্তরাধিকারীরা বিমার অর্থ পাওয়ার সুযোগ পান। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত প্রবাসী কর্মী বিমা ব্যবস্থায় মৃত্যুজনিত বিমা সুবিধার পরিমাণ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত।
তবে বিমার অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে কর্মীর বিমা কার্যকর ছিল কি না, প্রিমিয়াম জমা হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট পলিসির শর্ত পূরণ হয়েছে কি না এসব যাচাই করা জরুরি।
তাই পরিবারের উচিত ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট বিমা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্মীর বিমার তথ্য নিশ্চিত করা।
আরও পড়ুনঃ বিদেশে দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসার টাকা দেবে কে?
কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম আইন, কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত বিধান এবং চাকরির চুক্তি অনুযায়ী নিয়োগকর্তার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার তৈরি হতে পারে। অনেক দেশে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু হলে নিয়োগকর্তা বা তাঁর বিমা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩-এর ২২ ধারায় কর্মসংস্থান চুক্তিতে মৃত্যু বা জখমজনিত কারণে প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের বিষয় উল্লেখ করার কথা বলা হয়েছে। একই ধারায় চুক্তির দায়-দায়িত্বের ক্ষেত্রে বিদেশি নিয়োগকর্তা ও রিক্রুটিং এজেন্টের যৌথ ও পৃথক দায়ের কথাও রয়েছে।
তবে এ বিধানকে বিদেশের সব ঘটনার জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ও পাওয়ার পদ্ধতি নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, চুক্তি ও ঘটনার প্রমাণের ভিত্তিতে।
মৃত্যুর আগে কর্মীর বেতন বকেয়া থাকলে, চাকরির চুক্তি অনুযায়ী সার্ভিস বেনিফিট বা অন্যান্য পাওনা থাকলে সেগুলোও পরিবার দাবি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও চুক্তি অনুযায়ী ছুটির পাওনা, গ্র্যাচুইটি বা চাকরি-সংক্রান্ত অন্যান্য সুবিধাও প্রাপ্য হতে পারে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে এসব পাওনা আদায়ে সহায়তা নেওয়া যায়। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দেশে মামলা পরিচালনার জন্য পরিবারের কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেওয়া হয়।
প্রবাসে কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পরিবারের উচিত দ্রুত সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রমকল্যাণ উইং এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা। পাশাপাশি নিচের কাগজপত্র সংগ্রহে রাখা জরুরি-
- মৃত কর্মীর পাসপোর্ট, ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের কপি।
- বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র বা স্মার্ট কার্ডের তথ্য।
- বিদেশি নিয়োগকর্তা ও কোম্পানির নাম-ঠিকানা।
- চাকরির চুক্তিপত্র ও বেতনসংক্রান্ত কাগজপত্র।
- মৃত্যুসনদ এবং কর্মস্থলের দুর্ঘটনা হলে দুর্ঘটনা বা পুলিশি প্রতিবেদন।
- বিমার কাগজপত্র ও মনোনীত ব্যক্তির তথ্য।
- ওয়ারিশ সনদ, পরিবারের সদস্য সনদ ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য।
ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে দূতাবাসের সহায়তায় স্থানীয় আইনজীবী নিয়োগ এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রস্তুত করতে হতে পারে।
পরিবার ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ওয়েবসাইট www.wewb.gov.bd এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট www.probashi.gov.bd থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও যোগাযোগের ঠিকানা পেতে পারে। বিদেশে অবস্থানরত কর্মীর পরিবারের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রমকল্যাণ উইংয়েও যোগাযোগ করতে পারেন।
কর্মীর মৃত্যুর পর পরিবারকে শুধু সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর না করে নিয়োগকর্তার ক্ষতিপূরণ, বিমার অর্থ এবং বকেয়া পাওনার বিষয়গুলোও আলাদাভাবে অনুসরণ করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান পাওনা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা বিষয়টি জটিল হলে দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের আইনি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৩ লাখ টাকার সরকারি অনুদান, ৩৫ হাজার টাকার মরদেহ পরিবহন ও দাফন সহায়তা, বিমার অর্থ এবং নিয়োগকর্তার ক্ষতিপূরণ—এগুলো আলাদা খাত। যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ হলে একাধিক খাত থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তাই একটি খাতের টাকা পেয়েই অন্য পাওনার দাবি ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।



