
গবেষণা ও উদ্ভাবনে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় টানা পাঁচ বছর জায়গা করে নিয়েছেন মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি গবেষক ও অধ্যাপক ড. শফিক সিদ্দিকী। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত এই তালিকায় ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর নাম রয়েছে।
দীর্ঘ গবেষণাজীবনে ড. শফিক সিদ্দিকীর প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা দেড় শতাধিক। এর মধ্যে উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্র রয়েছে ১০৮টি। এ ছাড়া ২২টি নন-ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর এবং ২০টি নন-ইনডেক্সড প্রকাশনা রয়েছে তাঁর। উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন চারটি পেটেন্ট ও চারটি ট্রেডমার্ক। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অন্তত ৩৯টি সম্মেলন ও সেমিনারে তিনি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেছেন।
ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া সাবাহতে (ইউএমএস) অধ্যাপনার সময় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এক ডজনের বেশি কোর্স পরিচালনা করেছেন শফিক সিদ্দিকী। তাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধানে পিএইচডি ও এমএসসি পর্যায়ে গবেষণা করেছেন ২৭ জন। তাঁদের মধ্যে ২৫ জন ইতোমধ্যে সফলভাবে ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।
গবেষণার প্রভাব বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক সাইটেশনেও তাঁর অবস্থান উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে স্কোপাসে তাঁর এইচ-ইনডেক্স ৩৩ এবং গুগল স্কলারে ৪০। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে তিনি পেয়েছেন ৩৭টি বড় গবেষণা অনুদান। এর মধ্যে আটটি প্রকল্প স্থানীয় কমিউনিটি ও বৃহৎ শিল্পখাতের প্রায়োগিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সম্প্রতি কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম বড় হালাল পণ্যের বাণিজ্য প্রদর্শনী ‘মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল হালাল শোকেস’ (মিহাস)-এর ২২তম আসরেও অংশ নেন এই বাংলাদেশি বিজ্ঞানী। বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিশেষ আমন্ত্রণে সেখানে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে নিজের গবেষণালব্ধ দুটি উদ্ভাবন ‘ভিভিফাই’ ও ‘ট্রিয়াল’ নিয়ে অংশ নেন তিনি।
গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে শিল্পোৎপাদনের মাধ্যমে বাজারজাত পণ্যে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে শফিক সিদ্দিকীর উদ্যোগটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। ল্যাবরেটরির গবেষণা থেকে শিল্পপণ্য এবং সেখান থেকে সাধারণ ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তাদের কাছেও প্রশংসা পেয়েছে।
মিহাসে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্যে ড. শফিক সিদ্দিকী বলেন, ‘তুমি নিজেকে যতটুকু সক্ষম বলে ভাবো, তোমার সম্ভাবনা আসলে তার চেয়েও অনেক দূর বিস্তৃত। দরকার শুধু সংকল্পকে দৃঢ় করা এবং প্রচেষ্টায় ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকলে সফলতা ধরা দেবেই।’
বিজ্ঞান ও গবেষণায় অবদানের জন্য এখন পর্যন্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৭০টি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে সাবাহ রাজ্যের ‘এসই কিনাবালু ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড’, কোরিয়া ইনভেনশন একাডেমির স্বর্ণপদক, জার্মানির আইইএনএ-২০২১ পুরস্কার, মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোক্তা প্রকল্প পুরস্কার এবং পিইসিপিটিএ ও আইটিইএক্সের একাধিক স্বর্ণপদক।
২০১৪ সালে তিনি পান ‘প্রসপার-নেট-স্কোপাস তরুণ বিজ্ঞানী পুরস্কার’। এর দুই বছর পর, ২০১৬ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শাখায় স্কোপাস জার্নালে সর্বাধিক সাইটেশনের জন্য ইউএমএসের সর্বোচ্চ সাইটেশন পুরস্কার লাভ করেন।
মালয়েশিয়ার জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেল টিভি১, টিভি২ ও টিভি৭-এ তাঁর উদ্ভাবন নিয়ে একাধিক বিশেষ প্রতিবেদনও প্রচারিত হয়েছে।
শিক্ষাদান, মৌলিক গবেষণা এবং গবেষণালব্ধ উদ্ভাবনের বাণিজ্যিক প্রয়োগকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ড. শফিক সিদ্দিকী। তাঁর এই দীর্ঘ গবেষণাযাত্রা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে বাংলাদেশি গবেষকদের অবদানের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।



