
স্বর্ণের বাজারে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের দামের পার্থক্য নিয়ে ক্রেতাদের আগ্রহের শেষ নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, দুবাই, সৌদি আরব, পাকিস্তান কিংবা সিঙ্গাপুরে স্বর্ণের দাম কোথায় বেশি, আর কোথায় তুলনামূলক কম—তা জানতে চান অনেকেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রায় একই মানদণ্ড অনুসরণ করলেও স্থানীয় বাজারে কেন দামের এত পার্থক্য?
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দর, ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান, আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং গয়না তৈরির মজুরি—সব মিলিয়েই নির্ধারিত হয় একজন ক্রেতাকে শেষ পর্যন্ত কত টাকা দিতে হবে।
আজ শুক্রবার ( ৬ নভেম্বর ২০২৬) বাংলাদেশে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি ২ লাখ ২৬ হাজার ৯২৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের দিনের তুলনায় দাম কমেছে ২ হাজার ৭৪১ টাকা। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন—বাজুসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন দাম কার্যকর হয়েছে সকাল ১০টা থেকে। এখানে ভরিপ্রতি দামের সঙ্গে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে গয়নার নকশা ও তৈরির মজুরি যোগ হলে ক্রেতার খরচ আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বের কোন দেশে স্বর্ণের দাম বেশি?
বিশ্বের সব দেশের স্বর্ণের দাম নিয়ে একই দিন, একই বিশুদ্ধতা এবং একই ধরনের বিক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে নির্ভরযোগ্য একক সরকারি র্যাঙ্কিং পাওয়া যায় না। তাই কোনো একটি দেশকে নিশ্চিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দামি স্বর্ণের বাজার বলা কঠিন।
তবে ৩ নভেম্বর ২০২৬-এর ভারত, দুবাই ও পাকিস্তানের বাজারদর তুলনা করে এনডিটিভি প্রফিটের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারত ছিল এই তিন বাজারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামের দেশ। তুলনায় পাকিস্তানে স্বর্ণের দাম ছিল সবচেয়ে কম, আর দুবাই ছিল মাঝামাঝি অবস্থানে।
প্রতিবেদনটিতে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি গ্রামের দাম দেখানো হয়—পাকিস্তানে ৩৫ হাজার ২৮০ পাকিস্তানি রুপি, দুবাইয়ে ৪৭৮ দিরহাম এবং ভারতে ১৩ হাজার ৯৬৪ ভারতীয় রুপি। তবে ভিন্ন মুদ্রার এই অঙ্ক সরাসরি তুলনা করা যায় না; বিনিময় হার অনুযায়ী হিসাব করতে হয়।
অন্যদিকে, ৪ নভেম্বর ২০২৬-এর তথ্যের ভিত্তিতে ইকোনমিক টাইমস জানায়, পাকিস্তানে ১০ গ্রাম ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভারতীয় মুদ্রায় রূপান্তর করলে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬৫৪ রুপি। একই পরিমাণ স্বর্ণের ভারতীয় বাজারদর ছিল প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৫ রুপি। অর্থাৎ ওই দিনের হিসাবে পাকিস্তানে দাম প্রায় ১৫ শতাংশ কম ছিল।
বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম কত?
বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করে বাজুস। আন্তর্জাতিক বাজারে বিশুদ্ধ স্বর্ণের দর, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম এবং অন্যান্য খরচ বিবেচনায় সংগঠনটি বিভিন্ন ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ঘোষণা করে।
৬ নভেম্বর ২০২৬-এর বাজারদর অনুযায়ী—
২২ ক্যারেট: প্রতি ভরি ২ লাখ ২৬ হাজার ৯২৩ টাকা
২১ ক্যারেট: বাজুসের নির্ধারিত স্থানীয় দর অনুযায়ী
১৮ ক্যারেট: বাজুসের নির্ধারিত স্থানীয় দর অনুযায়ী
সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ: বাজুসের নির্ধারিত স্থানীয় দর অনুযায়ী
এক ভরি সমান ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম। ফলে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরিপ্রতি ঘোষিত দামকে ওজনে ভাগ করলে প্রতি গ্রামের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৯ হাজার ৪৪৮ টাকা। তবে গয়না কেনার সময় মজুরি ও প্রযোজ্য অন্যান্য খরচের কারণে চূড়ান্ত মূল্য আরও বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশে বাজুস সাধারণত ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেট এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দর ঘোষণা করে। ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের আলাদা গয়নার দর সাধারণত ঘোষণা করা হয় না।
দুবাইয়ে স্বর্ণের দাম তুলনামূলক কম কেন?
দুবাইকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দ্রুত দামের সমন্বয় হয়। বড় বাজার, প্রতিযোগিতামূলক বিক্রেতা, স্বর্ণ আমদানি ও বাণিজ্যের অবকাঠামো এবং ক্রেতার পছন্দের বৈচিত্র্য দুবাইয়ের বাজারকে আকর্ষণীয় করেছে।
তবে দুবাইয়ে স্বর্ণ মানেই সব সময় সবচেয়ে সস্তা—এমন নয়। সেখানে স্বর্ণের বিশুদ্ধতা, দোকানভেদে বিক্রয়মূল্য, গয়না তৈরির মজুরি এবং প্রযোজ্য ভ্যাট বিবেচনা করতে হয়। একই ওজন ও ক্যারেটের স্বর্ণ কিনলেও এক দোকানের সঙ্গে অন্য দোকানের দামে পার্থক্য থাকতে পারে।
স্বর্ণের দাম দেশভেদে আলাদা হয় কেন?
স্বর্ণের দাম নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারদর: বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম সাধারণত মার্কিন ডলারে নির্ধারিত হয়। আন্তর্জাতিক চাহিদা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সুদের হার, ডলারের শক্তি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা স্বর্ণের দামে প্রভাব ফেলে।
দ্বিতীয়ত, মুদ্রার বিনিময় হার: ডলারের বিপরীতে কোনো দেশের মুদ্রার মান কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও স্থানীয় মুদ্রায় দাম বেড়ে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, আমদানি শুল্ক ও কর: স্বর্ণ আমদানিতে শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর থাকলে স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ে। ফলে একই আন্তর্জাতিক দরের স্বর্ণ এক দেশে অন্য দেশের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হতে পারে।
চতুর্থত, গয়না তৈরির মজুরি: স্বর্ণের মূল দামের সঙ্গে গয়না তৈরির মজুরি যুক্ত হয়। নকশা, কারুকাজ, ব্র্যান্ড ও দোকানভেদে এই মজুরি ভিন্ন হতে পারে।
পঞ্চমত, স্থানীয় সরবরাহ ও চাহিদা: কোনো দেশে স্বর্ণের সরবরাহ কম থাকলে বা চাহিদা বেশি হলে স্থানীয় বাজারে অতিরিক্ত মূল্য যোগ হতে পারে।
স্বর্ণ কেনার আগে কোন বিষয়গুলো দেখা জরুরি?
বিদেশ থেকে স্বর্ণ কিনতে গেলে শুধু প্রতি গ্রামের দাম দেখলেই হবে না। একই ক্যারেটের স্বর্ণ কি না, হলমার্ক আছে কি না, গয়না তৈরির মজুরি কত, ভ্যাট ও অন্যান্য কর কত—এসব হিসাব করতে হবে।
এ ছাড়া বিদেশ থেকে দেশে স্বর্ণ আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রযোজ্য শুল্ক ও ব্যাগেজ বিধিমালা মানতে হবে। অনুমোদিত সীমার বেশি স্বর্ণ আনলে অতিরিক্ত শুল্ক বা আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই কেনার আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ ব্যাগেজ বিধিমালা যাচাই করা জরুরি।
বিশ্বের কোন দেশে স্বর্ণ সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়—এর উত্তর নির্ভর করে আপনি স্বর্ণের আন্তর্জাতিক বাজারদর, স্থানীয় খুচরা দর, নাকি গয়না তৈরিসহ চূড়ান্ত মূল্য তুলনা করছেন তার ওপর।
ভারত, দুবাই ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক তুলনায় ভারতের বাজারে দাম বেশি এবং পাকিস্তানে তুলনামূলক কম দেখা গেছে। বাংলাদেশে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরিপ্রতি দাম ২ লাখ ২৬ হাজার ৯২৩ টাকা। তবে এই দামকে অন্য দেশের ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যাবে না।
অর্থাৎ, স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে শুধু কোন দেশে দাম কম—সেটিই শেষ কথা নয়। বিশুদ্ধতা, কর, মজুরি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং দেশে আনার নিয়ম—সব হিসাব করেই প্রকৃত সাশ্রয় নির্ধারণ করতে হবে।



