অন্য খবর

এই সময়ে জ্বর? যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন

অক্টোবর বা নভেম্বরে জ্বর হলে অনেকে একে ঋতু পরিবর্তনজনিত অসুস্থতা বলে মনে করেন। তবে সব জ্বরের কারণ আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়। বর্ষার পরও মশাবাহিত সংক্রমণ, দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ানো রোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। এসব রোগের অনেক উপসর্গ একই রকম হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়া জ্বরের সঠিক কারণ শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।

এ সময়ে জ্বর হলে যেসব সংক্রমণের বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, সেগুলো হলো:

১. ডেঙ্গু: তীব্র জ্বর ও শরীর ব্যথায় সতর্ক থাকুন

ডেঙ্গু সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। এই মশা দিনের বেলায় কামড়ায় এবং বাড়ির ভেতরে ও বাইরে দুই জায়গাতেই থাকতে পারে। বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও বৃষ্টি কমে যাওয়ার পরও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। বাড়ির আশপাশে বিভিন্ন পাত্র, কুলার, হাঁড়ি কিংবা অন্য কোনো স্থানে পানি জমে থাকলে সেখানে মশার বংশবিস্তার হতে পারে।

ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও গাঁটে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে ফুসকুড়ি।

তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, বমি কিংবা মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব অথবা শ্বাসকষ্ট হলে দেরি করা উচিত নয়। বিশেষ করে জ্বর কমতে শুরু করার সময়ও ডেঙ্গুর বিপৎসংকেত দেখা দিতে পারে। তাই জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে, এমনটা মনে করা ঠিক নয়।

ডেঙ্গু হয়েছে বলে সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিজে থেকে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনজাতীয় ওষুধ খাবেন না। এসব ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।

২. ম্যালেরিয়া: কাঁপুনিসহ জ্বর অবহেলা করবেন না

ম্যালেরিয়া একটি পরজীবীঘটিত রোগ। সংক্রমিত মশার কামড়ে এ রোগ ছড়ায়। এর লক্ষণ হিসেবে জ্বর, কাঁপুনি, ঘাম, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, ক্লান্তি, বমি বমি ভাব ও বমি হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিরতিতে জ্বর ও কাঁপুনি দেখা দেয়। তবে সবার ক্ষেত্রে লক্ষণের ধরন এক রকম হয় না।

ম্যালেরিয়া দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন। কাঁপুনিসহ জ্বর হলে একে শুধু ঠান্ডা আবহাওয়া বা সাধারণ ভাইরাসের সংক্রমণ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। রোগীর উপসর্গ ও সংশ্লিষ্ট এলাকার সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা অথবা দ্রুত রোগ শনাক্তের পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।

এ ছাড়া বিভ্রান্তি, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, চরম দুর্বলতা কিংবা চেতনা কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা জরুরি চিকিৎসার পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

৩. চিকুনগুনিয়া: গাঁটে ব্যথা হলে গুরুত্ব দিন

চিকুনগুনিয়াও মশাবাহিত একটি সংক্রমণ, যা বর্ষাকাল ও বর্ষা-পরবর্তী সময়েও ছড়াতে পারে। এ রোগের অনেক লক্ষণ ডেঙ্গুর সঙ্গে মিলে যায়। ফলে শুধু উপসর্গ দেখে দুটি রোগের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হতে পারে।

চিকুনগুনিয়ার অন্যতম সাধারণ লক্ষণ হলো হঠাৎ জ্বরের সঙ্গে গাঁটে ব্যথা। এর পাশাপাশি মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, ত্বকে ফুসকুড়ি ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। জ্বর সেরে যাওয়ার পরও গাঁটের ব্যথা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।

লক্ষণ গুরুতর হলে বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার উপসর্গে মিল থাকায় সঠিক রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে হতে পারে।

৪. ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ

তাপমাত্রার পরিবর্তন, ভ্রমণ, জনসমাগমপূর্ণ স্থান এবং ঘরের ভেতরে মানুষের সমাবেশ শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বাড়াতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা, অন্যান্য ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং কোভিড-১৯-এর কারণে জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা সাধারণত হঠাৎ শুরু হয়। এ সময় জ্বর, শরীর ব্যথা ও তীব্র ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। তবে শুধু উপসর্গের ভিত্তিতে নির্ভরযোগ্যভাবে বলা যায় না, কোন ভাইরাসের কারণে সংক্রমণ হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বয়স্ক ব্যক্তি, ছোট শিশু, গর্ভবতী নারী এবং নির্দিষ্ট কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এসব সংক্রমণে জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে।

শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, বিভ্রান্তি, ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়া কিংবা শরীরে পানিশূন্যতার গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখা, ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে থাকার মতো অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।

৫. টাইফয়েড ও অন্যান্য পানিবাহিত সংক্রমণ

দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে টাইফয়েডসহ বিভিন্ন সংক্রমণ ছড়াতে পারে। এ ছাড়া ডায়রিয়া ও বমির মতো উপসর্গ সৃষ্টিকারী রোগও দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়াতে পারে। পানি সরবরাহের ব্যবস্থা বা খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের স্বাস্থ্যবিধি ঠিক না থাকলে এসব রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

এন্টারিক ফিভার, যা সাধারণত টাইফয়েড নামে পরিচিত, হলে একটানা জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, পেটে অস্বস্তি, ক্ষুধামান্দ্য এবং মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস বা পাকস্থলী ও অন্ত্রের প্রদাহের কারণে সাধারণত ডায়রিয়া, বমি ও পেটে তীব্র ব্যথা হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর সঙ্গে জ্বরও দেখা দেয়।

এসব সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ পানি পান করা, খাওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধোয়া এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে সদ্য প্রস্তুত করা খাবার খাওয়া জরুরি। একটানা জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ শুধু উপসর্গ দেখে টাইফয়েড নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button