অন্য খবর

সকালে দাঁত না মেজেই খাচ্ছেন? বাড়তে পারে যেসব সমস্যা

কালে ঘুম থেকে ওঠার পর মুখে দুর্গন্ধ, জিহ্বায় আস্তরণ কিংবা তিক্ত ও অস্বস্তিকর স্বাদ অনুভব করেন অনেকে। এর অন্যতম কারণ হলো ঘুমের সময় মুখে লালা উৎপাদন কমে যাওয়া। এ সময় মুখের ব্যাকটেরিয়ার কার্যকলাপ এবং সেগুলোর তৈরি বিভিন্ন পদার্থের কারণে এমনটা হতে পারে।

তাড়াহুড়ার কারণে কেউ কেউ সকালে দাঁত না মেজেই নাশতা করে ফেলেন। একদিন দাঁত না মেজে খাবার খেলে সাধারণত বড় কোনো সমস্যা হয় না। তবে নিয়মিত এমন অভ্যাস থাকলে দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নাশতার চিনি ও শ্বেতসার মুখের ব্যাকটেরিয়ার জন্য খাদ্য হিসেবে কাজ করে। এর ফলে দাঁতের ওপর প্লাক জমা এবং দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

সকালে মুখ পরিষ্কার করা জরুরি কেন?

রাতে ঘুমানোর সময় লালা উৎপাদন কমে যায়। লালা মুখের খাবারের অবশিষ্টাংশ পরিষ্কার করতে, ব্যাকটেরিয়ার তৈরি অ্যাসিডের প্রভাব কমাতে এবং দাঁতের এনামেল সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঘুমের সময় লালার প্রবাহ কমে যাওয়ায় মুখের স্বাভাবিক সুরক্ষাব্যবস্থাও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ সময় দাঁতের উপরিভাগ ও মাড়ির সংযোগস্থলে প্লাক নামের আঠালো স্তর জমতে পারে। এতে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। এসব ব্যাকটেরিয়ার কার্যকলাপ মুখে দুর্গন্ধ ও অস্বস্তিকর স্বাদের কারণ হতে পারে। নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার না করলে প্লাক জমার পরিমাণ বাড়ে এবং দাঁত ও মাড়ির নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

২০২১ সালে পিএলওএস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের ঘুমের আগে ও পরের মুখের জীবাণুসমষ্টি বা বায়োফিল্মের পরিবর্তন পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা দেখেছেন, ঘুমের পর মুখের নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার আপেক্ষিক উপস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটে। গবেষণাটি ছোট পরিসরে পরিচালিত হলেও এর ফল থেকে বোঝা যায়, রাতের ঘুমের সময় মুখের জীবাণুসমষ্টিতে পরিবর্তন হতে পারে।

নিয়মিত সকালে দাঁত না মেজে খাবার খাওয়ার অভ্যাসের কারণে কী কী সমস্যা দেখা দিতে পারে, তা জেনে নেওয়া যাক।

১. দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে

সকালের নাশতায় চা, বিস্কুট, পাউরুটি বা পরোটার মতো খাবার অনেকেই খেয়ে থাকেন। এসব খাবারের মধ্যে চিনি ও শ্বেতসার থাকে। মুখের কিছু ব্যাকটেরিয়া এসব শর্করা ব্যবহার করে অ্যাসিড তৈরি করে। এই অ্যাসিড দাঁতের বাইরের শক্ত আবরণ এনামেলের খনিজ উপাদান ক্ষয় করতে পারে।

দাঁতের ওপর আগে থেকেই প্লাক জমে থাকলে খাবারের শর্করা ব্যাকটেরিয়ার জন্য আরও সহজলভ্য হয়। বারবার অ্যাসিডের সংস্পর্শে এলে এনামেল ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এভাবে দাঁতের ক্ষয় এবং পরবর্তী সময়ে দাঁতে গর্ত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

তবে একবার দাঁত না মেজে নাশতা করলেই দাঁতে গর্ত হবে, এমন নয়। দাঁতের ক্ষয় নির্ভর করে খাদ্যাভ্যাস, ফ্লোরাইডের ব্যবহার, লালার পরিমাণ ও কার্যকারিতা এবং মুখ পরিষ্কারের অভ্যাসসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।

২. মাড়িতে প্রদাহ ও রক্তপাত হতে পারে

দাঁতের ওপর ও মাড়ির কিনারায় জমে থাকা প্লাক নিয়মিত পরিষ্কার না করলে মাড়িতে প্রদাহ দেখা দিতে পারে। এর ফলে মাড়ি লাল হয়ে যাওয়া, ফুলে ওঠা এবং দাঁত ব্রাশ করার সময় রক্তপাতের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘদিন প্লাক জমে থাকলে তা শক্ত হয়ে টারটারে পরিণত হতে পারে। একবার টারটার তৈরি হলে সাধারণভাবে দাঁত ব্রাশ করে তা পুরোপুরি দূর করা যায় না। এ ক্ষেত্রে দন্তচিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত ডেন্টাল হাইজিনিস্টের মাধ্যমে পেশাদার পদ্ধতিতে পরিষ্কার করানোর প্রয়োজন হতে পারে।

এ সমস্যা সাধারণত একদিন দাঁত না মাজার কারণে তৈরি হয় না। বরং দীর্ঘদিন ধরে মুখ পরিষ্কারে অবহেলা করলে ঝুঁকি বাড়ে। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা এবং দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার রাখার অভ্যাস প্লাক নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এতে মাড়ির প্রদাহসহ আরও গুরুতর সমস্যা প্রতিরোধের সম্ভাবনা বাড়ে।

৩. মুখের দুর্গন্ধ থেকে যেতে পারে

ঘুম থেকে ওঠার পর মুখে দুর্গন্ধ হওয়া বেশ সাধারণ। রাতে লালা উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি জিহ্বা ও দাঁতের আশপাশে থাকা ব্যাকটেরিয়া বিভিন্ন গন্ধযুক্ত যৌগ তৈরি করতে পারে। এসব যৌগের কারণে নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ হয়।

নাশতা খেলে মুখের কিছু খাবারের অবশিষ্টাংশ সরে যেতে পারে, কিন্তু শুধু খাওয়ার মাধ্যমে দাঁত ও জিহ্বায় জমে থাকা ব্যাকটেরিয়ার স্তর দূর হয় না। তাই দাঁত ও জিহ্বা ঠিকভাবে পরিষ্কার না করলে মুখের দুর্গন্ধ থেকে যেতে পারে কিংবা কিছু সময় পর আবার ফিরে আসতে পারে।

খাবারের সঙ্গে অল্প কিছু ব্যাকটেরিয়া গিলে ফেলা হয়। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে সাধারণত এটিই প্রধান উদ্বেগের বিষয় নয়। পাকস্থলীর অ্যাসিড অনেক জীবাণু নিষ্ক্রিয় করতে পারে। বরং দাঁত ও মাড়িতে থেকে যাওয়া ব্যাকটেরিয়ার কার্যকলাপ এবং সেখানকার অপরিষ্কার পরিবেশই মুখের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সকালের নাশতার আগে, নাকি পরে দাঁত মাজবেন?

সকালে দাঁত মাজার সঠিক সময় নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে। সাধারণভাবে ঘুম থেকে উঠে নাশতার আগে দাঁত মাজা একটি ভালো অভ্যাস। এতে রাতের বেলায় জমে থাকা প্লাক পরিষ্কার হয় এবং ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্টের সুরক্ষামূলক উপাদান দাঁতের ওপর থাকে।

ফ্লোরাইড দাঁতের এনামেলকে অ্যাসিডের আক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি কমায়। তাই সকালে দাঁত মাজার পাশাপাশি রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত মাজাও জরুরি। দিনে দুবার ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে প্রায় দুই মিনিট করে দাঁত ব্রাশ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

কেউ নাশতার পরে দাঁত মাজতে চাইলে খাবারের ধরনও বিবেচনায় রাখা উচিত। বিশেষ করে কমলার রস বা অন্য অম্লীয় খাবার খাওয়ার পরপরই দাঁত মাজলে নরম হয়ে যাওয়া এনামেলের ক্ষতি হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করা ভালো।

সব মিলিয়ে, সকালে একদিন দাঁত না মেজে খাবার খেলে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে প্রতিদিন দাঁত পরিষ্কার না করে নাশতা করার অভ্যাস এড়ানো উচিত। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ, দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার এবং সঠিক মুখের পরিচর্যা দাঁত ও মাড়ি সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button