অন্য খবর

বালিশের পাশে ফোন রেখে ঘুমালে কী হতে পারে?

ঘুমানোর আগে শেষবারের মতো ফোন দেখা, আর সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেওয়া। অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে এই অভ্যাস। কেউ বালিশের নিচে, কেউ বিছানার পাশে টেবিলে, আবার কেউ চার্জে লাগিয়ে ফোন রাখেন বিছানার কাছেই। কিন্তু রাতে ফোন ব্যবহার এবং ঘুমের সময় সেটি কাছে রাখার কিছু প্রভাব রয়েছে, যা এড়িয়ে চলা সম্ভব।

রাতে ফোনের ব্যবহার ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। পাশাপাশি তৈরি হতে পারে অস্বাস্থ্যকরভাবে পর্দা দেখার অভ্যাস এবং কিছু নিরাপত্তাঝুঁকি। ফোনের বিকিরণ নিয়ে নানা উদ্বেগ থাকলেও, বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় শুধু বিছানার পাশে মোবাইল ফোন রাখার কারণে ক্যানসার বা অন্য গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হয়, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ঘুমের ওপর প্রভাব এবং চার্জ দেওয়ার সময় ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।

১. নীল আলো ব্যাহত করতে পারে ঘুম

রাতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হলো ঘুমের ওপর এর প্রভাব। ফোনের পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুম ও জেগে থাকার চক্র, অর্থাৎ সার্কাডিয়ান ছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে।

‘পার্সোনাল অ্যান্ড ইউবিকুইটাস কম্পিউটিং’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, সন্ধ্যায় আলোর সংস্পর্শে এলে মেলাটোনিন নামের হরমোনের নিঃসরণ কমে যেতে পারে। শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করতে এবং ঘুম ও জেগে থাকার চক্র নিয়ন্ত্রণে এই হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে আলোর উজ্জ্বলতা, কতক্ষণ আলোতে থাকা হচ্ছে এবং দিনের কোন সময়ে আলোটি চোখে পড়ছে, এসবের ওপর প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করে।

ঘুমানোর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোরাঘুরি, ভিডিও দেখা কিংবা বার্তা পড়ার অভ্যাস ঘুম আসতে দেরি করাতে পারে। পর্দার উজ্জ্বলতা কমিয়ে রাখলেও আকর্ষণীয় বা উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়বস্তু মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে পারে। ফলে সহজে ঘুম আসতে সমস্যা হতে পারে।

যা করবেন: ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে যাঁদের সহজে ঘুম আসে না, তাঁদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শোবার ঘরে মৃদু আলো ব্যবহার করুন এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ফোনের রাতের বিশেষ পর্দা বিন্যাস বা নাইট মোড নীল আলোর সংস্পর্শ কিছুটা কমাতে পারে। তবে এটি দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহারের কিংবা উত্তেজক বিষয়বস্তু দেখার প্রভাব দূর করতে পারে না।

২. ফোনের বিজ্ঞপ্তি ও কলে ভাঙতে পারে ঘুম

ফোন ব্যবহার না করলেও কল, বার্তার বিজ্ঞপ্তি কিংবা কম্পনের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। কোনো বার্তার শব্দে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। আবার অল্প সময়ের জন্য ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হলেও সকালে তা মনে নাও থাকতে পারে।

এভাবে বারবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে বিশ্রামের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে পরদিন ক্লান্তি, বিরক্তি কিংবা কাজে মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

এ ছাড়া রাতে ঘুম ভেঙে গেলে হাতের কাছে থাকা ফোন পরীক্ষা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। একপর্যায়ে এটি অভ্যাসে পরিণত হলে নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের রুটিন বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

যা করবেন: ঘুমানোর আগে ফোনে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ বা নীরব মোড চালু রাখতে পারেন। জরুরি প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কল আসার সুযোগ চালু রাখুন। রাতে ঘুম ভেঙে ফোন দেখার অভ্যাস কমাতে ফোনটি বালিশ থেকে কিছুটা দূরে রাখুন।

৩. ফোনের বিকিরণ কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?

মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বা আরএফ শক্তি নির্গত হয়। এটি একধরনের অ-আয়নীকরণকারী তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ। এক্স-রের মতো আয়নীকরণকারী বিকিরণের তুলনায় এর শক্তি কম। আরএফ বিকিরণের শক্তি সরাসরি ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়।

তবে মোবাইল ফোনের বিকিরণের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা রেডিওফ্রিকোয়েন্সি তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্রকে মানুষের জন্য ‘সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ হিসেবে গ্রুপ ২বি শ্রেণিতে রেখেছে। এর অর্থ, ক্যানসারের ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তবে এই শ্রেণিবিন্যাসের অর্থ এই নয় যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে ক্যানসার হয়, এমনটি প্রমাণিত হয়েছে।

পরবর্তী গবেষণাগুলোতেও বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বড় পরিসরের সম্ভাবনামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল ফোনে কথা বলেন, তাঁদের মস্তিষ্কের টিউমারের ঝুঁকি কম ব্যবহারকারীদের তুলনায় বেশি নয়।

সামগ্রিকভাবে, বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মোবাইল ফোন ব্যবহার ও ক্যানসারের মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। শুধু ফোন কাছে রেখে ঘুমানোর কারণে ক্যানসার হয়, এমন জোরালো প্রমাণও নেই।

যা করবেন: বিছানার পাশে ফোন রাখা আর কথা বলার সময় ফোন মাথার কাছে ধরে রাখা এক বিষয় নয়। রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণের সংস্পর্শ কমাতে চাইলে ফোনটি শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখতে পারেন। কথা বলার সময় স্পিকার ব্যবহার করাও একটি উপায়। এ ছাড়া সংযোগের প্রয়োজন না থাকলে ফোনে উড়োজাহাজ মোড চালু রাখতে পারেন।

৪. বালিশের নিচে ফোন চার্জ দেওয়া বিপজ্জনক

ঘুমের সময় ফোন কাছে রাখার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাঝুঁকির একটি হলো চার্জ দেওয়ার সময় ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া।

চার্জে থাকা ফোন বালিশ, কম্বল কিংবা তোশকের নিচে রাখলে তাপ আটকে যেতে পারে। এতে ফোনের তাপ বেরিয়ে যাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয় এবং অতিরিক্ত গরম হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ব্যাটারি ক্ষতিগ্রস্ত হলে, চার্জার ত্রুটিপূর্ণ হলে কিংবা তার নষ্ট থাকলে এ ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে পুড়ে যাওয়া বা আগুন লাগার মতো দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।

তাই ফোন ও চার্জার ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা মেনে চলা এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করতে পারে, এমন জায়গায় চার্জ দেওয়া জরুরি।

যা করবেন: বিছানার চাদর, বালিশ, কম্বলসহ দাহ্য বস্তু থেকে দূরে শক্ত ও সমতল জায়গায় ফোন চার্জ দিন। উপযুক্ত চার্জার ও তার ব্যবহার করুন। ব্যাটারি ফুলে গেলে, ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা চার্জারের তারে ত্রুটি দেখা দিলে সেটি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। কখনোই বালিশ বা তোশকের নিচে ফোন রেখে চার্জ দেবেন না।

৫. গভীর রাতে ফোন দেখা প্রভাব ফেলতে পারে মানসিক সুস্থতায়

বিছানার পাশে ফোন থাকলে গভীর রাতেও কাজের বার্তা, খবরের হালনাগাদ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে ঘুমানোর আগে মানসিকভাবে শান্ত হওয়ার সুযোগ কমে যায়।

সব সময় হাতের কাছে তথ্য পাওয়ার সুযোগ অনেক সময় অতিরিক্ত চিন্তার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে মন খারাপ করা খবর দেখলে কিংবা কোনো বার্তার দ্রুত উত্তর দেওয়ার চাপ অনুভব করলে মানসিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করা এবং কাজের বিজ্ঞপ্তি দেখতে থাকাও দৈনন্দিন চাপ থেকে মনকে সরিয়ে নেওয়া কঠিন করে তুলতে পারে।

তবে শুধু ফোন কাছে রাখলেই উদ্বেগ বা বিষণ্নতা তৈরি হবে, এমন নয়। কিন্তু রাতে অতিরিক্ত সময় পর্দায় চোখ রাখা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে, ঘুমাতে দেরি করাতে পারে এবং ঘুমের মান খারাপ করতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের অভ্যাস চলতে থাকলে তা মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

যা করবেন: কাজের বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে নিন। ঘুমানোর আগে ফোন দেখা বন্ধ করে বই পড়া, আরামদায়ক অডিও শোনা কিংবা ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার মতো শিথিল হওয়ার অভ্যাস করতে পারেন।

সব মিলিয়ে, ঘুমানোর সময় বালিশের পাশে ফোন রাখলেই গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে ফোনের আলো, বিজ্ঞপ্তি, গভীর রাত পর্যন্ত পর্দা দেখার অভ্যাস এবং অনিরাপদভাবে চার্জ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো ঘুম ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার সীমিত করা, প্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তি ছাড়া অন্যগুলো বন্ধ রাখা এবং বিছানা থেকে দূরে নিরাপদ জায়গায় ফোন চার্জ দেওয়াই ভালো অভ্যাস।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button