অন্য খবর

ওজন কমাতে সকালের নাস্তা বাদ দিচ্ছেন? শরীরে কী প্রভাব পড়ে

ব্যস্ততার কারণে অনেকেই সকালের নাস্তা না করেই দিনের কাজ শুরু করেন। কেউ ঘুম থেকে ওঠার পর ক্ষুধা অনুভব করেন না, আবার কেউ কাজের চাপ, ভ্রমণ কিংবা ওজন কমানোর লক্ষ্য থেকে সকালের খাবার এড়িয়ে যান। তবে সকালের নাস্তা বাদ দেওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, এর ফলে দিনের বাকি সময়ে খাওয়ার অভ্যাসে কী পরিবর্তন আসছে।

সকালে না খাওয়ার কারণে যদি দিনের পরের ভাগে তীব্র ক্ষুধা লাগে, রাতের খাবারে অতিরিক্ত খাওয়া হয় কিংবা বারবার হালকা খাবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, তাহলে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে দৈনিক খাবারের বড় অংশ রাতে খাওয়ার অভ্যাস হজম, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ, ঘুম এবং ওজন ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

সকালের নাস্তা বাদ দিলে রাতে বেশি খাওয়ার প্রবণতা কেন?

সকালের নাস্তা না খেলেই যে খাদ্যাভ্যাস অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠবে, তা নয়। দিনের বাকি সময়ে কী খাওয়া হচ্ছে এবং ক্ষুধা কীভাবে সামলানো হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সকালে খাবার না খেলে অনেকের দিনের পরের ভাগে ক্ষুধা বেড়ে যায়। রাতের খাবারের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে গিয়ে কেউ কেউ এতটাই ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েন যে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাবার খান। আবার কারও বারবার খাবার নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।

ব্যস্ত জীবনযাত্রা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। সকালে না খেয়ে, দুপুরে অল্প খাবার খেয়ে এবং বিকেল পর্যন্ত কাজে ব্যস্ত থেকে কেউ রাতে বাড়ি ফিরে দিনের বেশির ভাগ খাবার খেয়ে ফেলতে পারেন। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে এই সময়সূচিই তাঁর নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

দিনের বেশির ভাগ খাবার সন্ধ্যায় খেলে কী হয়?

দিনের সব সময় শরীর একইভাবে খাবার প্রক্রিয়াজাত করে না। বিপাকক্রিয়া এবং ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা দৈনিক জৈবিক ছন্দের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এ কারণে শুধু কী খাওয়া হচ্ছে তা নয়, কখন খাওয়া হচ্ছে, সেটিও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

২০২২ সালে ব্রিটিশ জার্নাল অব নিউট্রিশন-এ প্রকাশিত মানুষের ওপর করা গবেষণার একটি পর্যালোচনায় সময়সীমাবদ্ধ খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, দিনের অপেক্ষাকৃত আগে বা পরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ার অভ্যাস কিছু বিপাকীয় সূচকে উন্নতি আনতে পারে। তবে খাবার গ্রহণের সময়সূচি অনুযায়ী ফলাফলে পার্থক্য ছিল। কোন সময়সূচি সবচেয়ে কার্যকর, তা নিশ্চিত করতে আরও সুপরিকল্পিত গবেষণার প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন গবেষকেরা।

অর্থাৎ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ার কিছু সম্ভাব্য উপকার থাকলেও সবার জন্য একই সময়সূচি সমান কার্যকর হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো পর্যাপ্ত নয়।

রাতে বেশি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব পড়ে?

দিনের শেষ ভাগে বেশি খাবার খাওয়ার একটি সম্ভাব্য প্রভাব হলো রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের শুরুর ভাগে একই পরিমাণ খাবার খাওয়ার তুলনায় দিনের শেষ দিকে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করলে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক খারাপ হতে পারে। অর্থাৎ, খাবার গ্রহণের সময় শরীরের গ্লুকোজ ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দৈনিক খাবারের বড় অংশ রাতে খাওয়ার সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের অবনতি, হজমে পরিবর্তন এবং ঘুমের মান ব্যাহত হওয়ার সম্ভাব্য সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়া দিনের বিভিন্ন সময়ে ভিন্নভাবে কাজ করে বলে খাবারের সময় এসব প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাতে খেলেই খাবার ঠিকমতো হজম হবে না বা রক্তে শর্করা অবশ্যই বেড়ে যাবে। খাবারের পরিমাণ, ধরন, খাওয়ার সময় এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থাসহ একাধিক বিষয় এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

সকালের নাস্তা বাদ দিলেই সরাসরি ওজন বেড়ে যায়, এমন প্রমাণও নেই। কিন্তু এর ফলে রাতে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে সুষম খাদ্যতালিকা বজায় রাখা এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।

সকালের নাস্তা বাদ দিলে কি ওজন কমে?

শুধু সকালের নাস্তা বাদ দিলেই যে ওজন কমবে, তা নিশ্চিত নয়। ২০২৩ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন এন্ডোক্রিনোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় সকালের নাস্তা বাদ দেওয়ার ফলে শরীরের ওজন সামান্য কমেছিল। তবে একই সঙ্গে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়েছিল। গবেষকেরা আরও উল্লেখ করেন, এ বিষয়ে পাওয়া পরীক্ষার সংখ্যা সীমিত।

তাই ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য সবাইকে অবশ্যই সকালের নাস্তা খেতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত যেমন অতিসরলীকরণ, তেমনি নাস্তা বাদ দিলেই ওজন কমবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়। দিনের মোট খাবারের পরিমাণ, খাবারের পুষ্টিমান এবং ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাসের ওপরও ওজন নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করে।

মূল বিষয় হলো, সকালের নাস্তা বাদ দেওয়ার অভ্যাস দিনের বাকি সময়ে কী প্রভাব ফেলছে। কেউ যদি এভাবে খেয়েও সুষম খাদ্যতালিকা বজায় রাখতে পারেন এবং অতিরিক্ত ক্ষুধা অনুভব না করেন, তাহলে তা তাঁর জন্য সমস্যা নাও হতে পারে। কিন্তু নাস্তা বাদ দেওয়ার কারণে যদি রাতে বেশি খাওয়া, ঘন ঘন মিষ্টিজাতীয় খাবার গ্রহণ কিংবা গভীর রাতে হালকা খাবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, তাহলে খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্য আনা জরুরি।

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে শুধু একটি বেলার খাবার বাদ দেওয়ার ওপর নির্ভর না করে, সারাদিনের খাদ্যাভ্যাস এবং খাবারের সময়সূচি বিবেচনায় নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button