
ক্যানসার এমন একটি রোগ, যার অনেক ধরন প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন কারণে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। তবে দৈনন্দিন জীবনের কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ধূমপান ও তামাক এড়িয়ে চলা, অ্যালকোহল পান না করা বা কমানো এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যানসার পুরোপুরি প্রতিরোধের নিশ্চয়তা কোনো অভ্যাসই দিতে পারে না। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পরিচিত ঝুঁকির কারণগুলো এড়িয়ে চলা এবং প্রমাণভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্যানসারের ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই দৈনন্দিন জীবনে যে পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে, সেগুলো জেনে নেওয়া যাক।
১. ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলুন
ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ তামাকের ব্যবহার। সিগারেটের ধোঁয়ায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী বহু রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। এর মধ্যে বেঞ্জিন, ফরমালডিহাইড ও নির্দিষ্ট ধরনের নাইট্রোসামিন উল্লেখযোগ্য। এসব পদার্থ কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ক্যানসার সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে।
শুধু ধূমপানকারী নন, অন্যের সিগারেটের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরাও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শেও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ধূমপানের অভ্যাস থাকলে শুধু সিগারেটের সংখ্যা কমানোর পরিবর্তে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা ভালো। ধূমপান বন্ধ করতে প্রয়োজনে চিকিৎসক বা তামাক ছাড়ার সহায়তা কর্মসূচির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। বাড়ি ও কর্মস্থলকে ধোঁয়ামুক্ত রাখাও জরুরি।
২. নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন
ঘুমের সময় ও মান শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। অনিয়মিত ঘুম এবং রাতের আলো শরীরের দেহঘড়িতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী।
ঘুমানোর আগে ঘরের আলো কমিয়ে আনা এবং মুঠোফোন, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের পর্দা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে পারেন। এতে ঘুমের প্রস্তুতি নিতে সুবিধা হতে পারে। ঘুমানোর ঘর অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখাও ভালো অভ্যাস।
তবে রাত ১১টার মধ্যে ঘুমানো কিংবা রাত ১১টা থেকে ৩টার মধ্যে শরীরের ডিএনএ মেরামতের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া চলে, এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। একইভাবে, সামান্য নীল আলোতেই মেলাটোনিন নিঃসরণ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় বা এই হরমোন ক্যানসার প্রতিরোধ করে, এমন সিদ্ধান্তও নিশ্চিতভাবে দেওয়া যায় না। ঘুমের নিয়মিত অভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও একে ক্যানসার প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
৩. খাবারের সময় ও খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্য রাখুন
খাবারের সময়, পরিমাণ ও ধরন সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। কেউ কেউ রাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাতের খাবার শেষ করে পরদিন সকালে নাশতা করেন। যেমন, রাত ৮টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করে সকাল ৮টা বা ১০টায় নাশতা করলে খাবারের মধ্যবর্তী বিরতি ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা হতে পারে।
তবে সবার জন্য ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকর, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। উপবাসের সময় শরীরের কোষে বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়া সক্রিয় হতে পারে। এর মধ্যে অটোফ্যাজি নামে একটি প্রক্রিয়া রয়েছে, যাতে কোষের ক্ষতিগ্রস্ত বা অপ্রয়োজনীয় কিছু উপাদান ভেঙে পুনর্ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এ প্রক্রিয়াকে শরীরের সব বিষাক্ত পদার্থ বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান দূর করার ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা ঠিক নয়। নির্দিষ্ট সময় না খেয়ে থাকলেই ক্যানসারের ঝুঁকি কমে যায়, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
বরং নিয়মিত সুষম খাবার খাওয়া, শাকসবজি ও ফলমূল রাখা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলার দিকে নজর দেওয়া উচিত। দীর্ঘ সময় উপবাসের আগে নিজের বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ওষুধ ব্যবহারের বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।
৪. প্লাস্টিকের ব্যবহার ও রাসায়নিকের সংস্পর্শ সম্পর্কে সতর্ক থাকুন
খাবার সংরক্ষণ ও রান্নার পাত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু সতর্কতা প্রয়োজন। সব ধরনের প্লাস্টিকের পাত্র সমান নয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু প্লাস্টিক থেকে বিসফেনল-এ (বিপিএ) ও থ্যালেটের মতো রাসায়নিক খাবারে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। পাত্রের ধরন, তাপমাত্রা ও ব্যবহারের পরিস্থিতির ওপর এ ঝুঁকি নির্ভর করে।
তাই যে প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার রাখা বা মাইক্রোওয়েভে গরম করা নিরাপদ বলে উল্লেখ নেই, সেগুলো এ কাজে ব্যবহার না করাই ভালো। গরম খাবার সংরক্ষণের জন্য কাচ বা উপযুক্ত ধাতব পাত্র বেছে নিতে পারেন। নন-স্টিক পাত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা মেনে চলা এবং আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পাত্রটি বদলে ফেলা উচিত।
বিসফেনল-এ, থ্যালেট ও পিএফএএসের মতো রাসায়নিকের কিছু স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শ মানেই স্তন, জরায়ু, ডিম্বাশয় বা থাইরয়েডের ক্যানসার হবে, এমন প্রমাণ নেই। তাই নির্দিষ্ট রাসায়নিকের ঝুঁকি সম্পর্কে অতিরঞ্জিত দাবি না করে অপ্রয়োজনীয় সংস্পর্শ কমানো এবং নিরাপদ পাত্র ব্যবহারের দিকে নজর দেওয়া ভালো।
৫. অ্যালকোহল পান এড়িয়ে চলুন বা কমিয়ে দিন
অ্যালকোহল পান বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। শরীরে অ্যালকোহল ভেঙে অ্যাসিটালডিহাইড নামে একটি বিষাক্ত যৌগ তৈরি হয়, যা ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অ্যালকোহল শরীরে ইস্ট্রোজেনসহ কিছু হরমোনের মাত্রায়ও প্রভাব ফেলতে পারে, যা স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
অ্যালকোহল পানের সঙ্গে মুখগহ্বর, গলা, স্বরযন্ত্র, খাদ্যনালি, যকৃৎ, স্তন এবং বৃহদান্ত্র ও মলাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণভাবে অ্যালকোহল যত বেশি পান করা হয়, ঝুঁকিও তত বাড়ে। তবে কম পরিমাণে পান করলেও কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি থাকতে পারে।
তাই ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর জন্য অ্যালকোহল না পান করাই ভালো। যারা পান করেন, তারা পরিমাণ কমানোর কথা বিবেচনা করতে পারেন। অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া বা কমানোর ফলে সংশ্লিষ্ট কয়েক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমতে পারে।
ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে এই পাঁচটি অভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হেপাটাইটিস বি ও মানব প্যাপিলোমা ভাইরাসের টিকা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত। জীবনযাপনে পরিবর্তন ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে ক্যানসার প্রতিরোধের শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না।



