অন্য খবর

প্রতিদিন মুখে অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করা কি নিরাপদ?

ত্বকের যত্নে অ্যালোভেরা জেলের ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। ত্বকে শীতল ও আরামদায়ক অনুভূতি দেওয়ার পাশাপাশি এটি হালকা আর্দ্রতা জোগাতে পারে। শুষ্কতা, লালচে ভাব কিংবা তৈলাক্ত ত্বকের পরিচর্যায় অনেকেই নিয়মিত অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করেন। ব্রণ, কালো দাগ ও বলিরেখা কমানোর আশাতেও অনেকে এর ওপর ভরসা রাখেন।

ত্বকের যত্নে ব্যবহৃত কিছু উপাদানে থাকা রাসায়নিক বা অতিরিক্ত সুগন্ধি ত্বকে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। তবে বিশুদ্ধ অ্যালোভেরা জেল অধিকাংশ মানুষের ত্বকে সহনীয় হতে পারে। ত্বকে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া না হলে এটি নিয়মিত ব্যবহার করা যায়। কিন্তু অ্যালোভেরা জেল ময়েশ্চারাইজার, সূর্যরোধী ক্রিম কিংবা ব্রণের চিকিৎসার বিকল্প নয়।

প্রতিদিন অ্যালোভেরা জেল ব্যবহারের উপকারিতা কী?

অ্যালোভেরা জেল ত্বকে হালকা আর্দ্রতা জোগায় এবং শীতল অনুভূতি দেয়। ত্বকের সামান্য জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি কমাতেও এটি সহায়ক হতে পারে। এর হালকা গঠনের কারণে তৈলাক্ত ত্বকের অধিকারীদের কাছেও এটি পছন্দের উপাদান।

তবে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যায় অ্যালোভেরা কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো সীমিত। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ (এনসিসিআইএইচ) জানিয়েছে, ত্বকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অ্যালোভেরা কিছু সমস্যায় উপকার দিতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

২০২১ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ব্রণের ক্ষত ও ত্বকের রঞ্জকতাজনিত দাগের উন্নতির কথা উঠে আসে। ওই গবেষণায় আল্ট্রাসাউন্ড ও একটি বিশেষ মুখোশের সঙ্গে অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে শুধু অ্যালোভেরা জেল ব্যবহারের কারণেই ওই উন্নতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

অ্যালোভেরা ত্বকের পরিচর্যায় সহায়ক হতে পারে। তবে ব্রণ, কালো দাগ বা বয়সের ছাপ দূর করার প্রমাণিত চিকিৎসা হিসেবে একে বিবেচনা করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই।

টাটকা অ্যালোভেরা জেল, নাকি প্যাকেটজাত জেল?

অ্যালোভেরা জেলের নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করে এটি কীভাবে সংগ্রহ, প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করা হয়েছে, তার ওপর। গাছের পাতা থেকে সরাসরি জেল সংগ্রহ করে ব্যবহার করাকে অনেকে বেশি উপকারী মনে করেন। তবে পাতার সব অংশ ত্বকের জন্য সমান উপযোগী নয়।

অ্যালোভেরা পাতার ভেতরের স্বচ্ছ অংশ থেকে জেল পাওয়া যায়। অন্যদিকে, পাতার খোসার ঠিক নিচে থাকা স্তরে অ্যালোইনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানযুক্ত হলুদ রস বা ল্যাটেক্স থাকে। এসব উপাদান ত্বকে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। পাতা থেকে জেল সংগ্রহের সময় সতর্ক না হলে ওই হলুদ রসের কিছু অংশ জেলের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। ঘরে তৈরি জেল ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলেও তা দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অন্যদিকে, প্যাকেটজাত অ্যালোভেরা জেল সাধারণত নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়। এসব পণ্যে সংরক্ষণকারী উপাদান থাকতে পারে, যা জীবাণুর দূষণ ঠেকাতে সাহায্য করে। তবে কিছু পণ্যে সুগন্ধি, কৃত্রিম রং বা অ্যালকোহলও থাকতে পারে। এসব উপাদান সংবেদনশীল ত্বকে অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে।

তাই অ্যালোভেরা জেল কেনার আগে উপাদানের তালিকা দেখে নেওয়া ভালো। পণ্যের গায়ে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী তা সংরক্ষণ করতে হবে। জেলের গন্ধ, রং বা গঠনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সেটি ব্যবহার করা উচিত নয়।

প্রতিদিন অ্যালোভেরা জেল ব্যবহারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে?

অ্যালোভেরা জেল সাধারণত অনেকের ত্বকে সহনীয় হলেও কারও কারও ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এনসিসিআইএইচের নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ত্বকে অ্যালোভেরা ব্যবহারের পর জ্বালাপোড়া, চুলকানি, ফুসকুড়ি ও একজিমার মতো সমস্যা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বিশেষ করে সংবেদনশীল বা অ্যালার্জিপ্রবণ ত্বকে প্রতিদিন অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার উপযোগী নাও হতে পারে। সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

জ্বালাপোড়া: জেল লাগানোর পর ত্বকে জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব কিংবা সুচ ফোটানোর মতো অনুভূতি হতে পারে।

সংস্পর্শজনিত ত্বকের প্রদাহ: অ্যালোভেরার কোনো উপাদানের সংস্পর্শে এলে চুলকানিযুক্ত ও আঁশ ওঠা ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। একে সংস্পর্শজনিত ত্বকের প্রদাহ বলা হয়।

ত্বকের শুষ্কতা: শুধু অ্যালোভেরা জেল ব্যবহারের পর ত্বক টানটান বা শুষ্ক মনে হতে পারে। এর কারণ হতে পারে, জেলটি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে উপযোগী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা প্রয়োজন।

জীবাণুর দূষণ: বাড়িতে তৈরি জেল যথাযথভাবে প্রস্তুত ও সংরক্ষণ না করলে তাতে জীবাণু জন্মাতে পারে। ফলে ত্বকে সংক্রমণ বা অস্বস্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অ্যালোভেরা ব্যবহারের পর ফুসকুড়ি, ফোলাভাব বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বালাপোড়া দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। একজিমা, রোসেশিয়া কিংবা অ্যালোভেরায় আগে থেকে অ্যালার্জি থাকার ইতিহাস থাকলে নিয়মিত ব্যবহারের আগে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

মুখে অ্যালোভেরা জেল ব্যবহারের নিয়ম

নতুন কোনো অ্যালোভেরা জেল ব্যবহারের আগে ত্বকের ছোট একটি অংশে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। এ জন্য হাতের ভেতরের দিকে বা অন্য কোনো ছোট জায়গায় অল্প পরিমাণ জেল লাগিয়ে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এ সময়ে লালচে ভাব, চুলকানি, ফুসকুড়ি বা ফোলাভাব দেখা দেয় কি না, খেয়াল রাখতে হবে। তবে এমন পরীক্ষায় কোনো প্রতিক্রিয়া না হলেও ভবিষ্যতে অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হবে না, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।

জেলটি ত্বকে সহনীয় হলে পরিচর্যার নিয়মে এভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সকালে: প্রথমে মুখ পরিষ্কার করে নিন। প্রয়োজন হলে অ্যালোভেরা জেলের পাতলা স্তর লাগান। এরপর ত্বকের উপযোগী ময়েশ্চারাইজার ও সূর্যরোধী ক্রিম ব্যবহার করুন।

রাতে: মুখ পরিষ্কারের পর অ্যালোভেরা জেল লাগাতে পারেন। এরপর ত্বকের প্রয়োজন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।

ত্বক শুষ্ক হলে: ময়েশ্চারাইজারের পরিবর্তে শুধু অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার না করে উপযোগী ময়েশ্চারাইজারও লাগান। কারণ, অ্যালোভেরা জেল একা ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।

ব্রণের সমস্যা থাকলে: ব্রণের চিকিৎসায় চিকিৎসকের পরামর্শ এবং কার্যকারিতার প্রমাণ রয়েছে এমন পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অ্যালোভেরা জেলকে এসব চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

এ ছাড়া অ্যালোভেরা জেল সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে সুরক্ষা দেয় না। তাই দিনের বেলায়, এমনকি আকাশ মেঘলা থাকলেও, ত্বকের উপযোগী সূর্যরোধী ক্রিম ব্যবহার করা জরুরি।

খোলা ক্ষত বা গুরুতরভাবে পুড়ে যাওয়া ত্বকে ঘরে তৈরি অ্যালোভেরা জেল লাগানো উচিত নয়। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।

সব মিলিয়ে, ত্বকে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া না হলে অ্যালোভেরা জেল দৈনন্দিন পরিচর্যার অংশ হতে পারে। তবে এর ব্যবহার ত্বকের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী হওয়া উচিত। ব্রণ, কালো দাগ কিংবা ত্বকের অন্য কোনো সমস্যার চিকিৎসা হিসেবে শুধু অ্যালোভেরা জেলের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button