
ফ্যাটি লিভারকে সাধারণত অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে সম্পর্কিত রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে শরীরের গঠন পাতলা হলেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যকলাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণের মতো জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে লিভারে জমে থাকা চর্বি কমানো এবং রোগের অগ্রগতি ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফ্যাটি লিভারের একটি পরিচিত ধরনকে বর্তমানে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (এমএএসএলডি) বলা হয়। এ অবস্থায় লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে। এর সঙ্গে ইনসুলিন প্রতিরোধ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, রক্তে কোলেস্টেরলের অস্বাভাবিক মাত্রা, উচ্চ রক্তচাপ এবং পেটের অতিরিক্ত চর্বির সম্পর্ক রয়েছে।
তবে ফ্যাটি লিভারের উন্নতি ঘটাতে দ্রুত ওজন কমানো, কঠোর খাদ্যনিয়ম অনুসরণ কিংবা তথাকথিত শরীর পরিষ্কারের বিশেষ পদ্ধতির প্রয়োজন নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা যায় এমন খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
ওষুধ ছাড়াই কি ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?
অনেকের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে, জীবনযাপনের পরিবর্তনে ফ্যাটি লিভারের উন্নতি হতে পারে। খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কার্যকলাপে পরিবর্তন আনলে লিভারে জমে থাকা চর্বি কমতে পারে। পাশাপাশি প্রদাহ এবং লিভারের ক্ষতির ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
শরীরের ওজন ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারে জমে থাকা চর্বির পরিমাণ কমতে পারে। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লিভারের প্রদাহ এবং ফাইব্রোসিস বা লিভারে ক্ষতজনিত টিস্যু জমার উন্নতির জন্য শরীরের ওজন প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমানোর প্রয়োজন হতে পারে।
তবে ওজন কমানোই ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় নয়। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের মাধ্যমে ওজন না কমলেও লিভারের চর্বি ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে।
এখানে মনে রাখা জরুরি, লিভারে চর্বি কমে যাওয়া আর লিভারের সব ধরনের ক্ষতি পুরোপুরি সেরে যাওয়া এক বিষয় নয়। রোগের পর্যায়, লিভারে ক্ষতির মাত্রা এবং অন্য শারীরিক সমস্যার ওপর চিকিৎসার ফল নির্ভর করে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা বা শুধু জীবনযাপনের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
ওজন বেশি হলে ধীরে ধীরে কমান
অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা ধীরে ধীরে কমানো ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। এ জন্য কঠোর খাদ্যতালিকা অনুসরণ বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। বরং খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার ও পানীয় কমানো এবং দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে ওজন কমানোর চেষ্টা করা যায়।
দ্রুত ওজন কমানোর কঠোর পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা কঠিন। তাই এমন অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো, যা দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং দীর্ঘমেয়াদে অনুসরণ করা যায়।
অন্যদিকে, যাঁদের শরীরের ওজন স্বাভাবিক বা তুলনামূলক কম, তাঁদেরও ফ্যাটি লিভার হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অকারণে ওজন কমানোর চেষ্টা না করে রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কার্যকলাপের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চিনি ও পরিশোধিত শর্করা কমিয়ে দিন
অতিরিক্ত চিনি, চিনিযুক্ত পানীয় এবং পরিশোধিত শর্করাসমৃদ্ধ খাবার বেশি খেলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি ও বিপাকীয় সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে, যা ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
তাই কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত ফলের পানীয়, মিষ্টি, বিস্কুট, কেক এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত বেশি পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস কমানো উচিত।
এসব খাবারের পরিবর্তে আঁশ ও পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া ভালো। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, গোটা শস্য, ডাল, শিমজাতীয় খাবার, বাদাম এবং গোটা ফল রাখা যেতে পারে।
তবে ফ্যাটি লিভার হলে সব ধরনের শর্করা পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন নয়। বরং শর্করার ধরন, পরিমাণ এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ভারসাম্য বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার বেছে নিন
ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে সব ধরনের চর্বি খাওয়া বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং কোন ধরনের চর্বি খাওয়া হচ্ছে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট বেশি রয়েছে এমন খাবার সীমিত করে অসম্পৃক্ত চর্বির উৎস বেছে নেওয়া যেতে পারে। বাদাম, বিভিন্ন ধরনের বীজ, মাছ এবং উদ্ভিজ্জ তেলে অসম্পৃক্ত চর্বি পাওয়া যায়। অন্যদিকে, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার কম খাওয়া ভালো।
এ ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। পরিমিত খাবার গ্রহণ, পুষ্টিকর উপাদানের বৈচিত্র্য এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ একসঙ্গে ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন
ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ গুরুত্বপূর্ণ। ব্যায়ামের ফলে ওজনের পরিবর্তন না হলেও লিভারে জমে থাকা চর্বি কমতে পারে এবং শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে।
ফ্রন্টিয়ার্স ইন ফিজিওলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের সম্ভাব্য উপকারিতা তুলে ধরা হয়েছে। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা ও জগিংয়ের মতো ব্যায়াম শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম ভালো রাখতে এবং লিভারের চর্বি কমাতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি শক্তিবর্ধক ব্যায়াম পেশি তৈরি ও পেশির শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
ব্যায়াম শুরু করার জন্য প্রথমেই কঠিন কোনো কর্মসূচি অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটা বা অন্য কোনো সহজ কার্যকলাপ দিয়ে শুরু করা যায়। পরে ধীরে ধীরে সময় ও পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে। এমন ব্যায়াম বেছে নেওয়া ভালো, যা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকা, ইনসুলিন প্রতিরোধ, কোলেস্টেরলের অস্বাভাবিক মাত্রা এবং উচ্চ রক্তচাপ লিভারের রোগের অগ্রগতির ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ কারণে ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে শুধু খাবার পরিবর্তন বা ওজন কমানোর দিকে নজর দিলেই হবে না। নিয়মিত রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ পরীক্ষা করা এবং এসব সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি।
কিছু ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের জন্য ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে। এসব ওষুধ গ্রহণের অর্থ এই নয় যে জীবনযাপনের পরিবর্তন কাজে আসছে না। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস একসঙ্গে চালিয়ে গেলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ফ্যাটি লিভারের প্রাথমিক পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও ওজন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। তবে রোগের পর্যায় ও লিভারের ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসা ভিন্ন হতে পারে। তাই রোগ শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



