শুধু ভিসা আর টিকিট নয়, বিদেশ যাওয়ার আগে যে প্রশিক্ষণগুলো জরুরি
বিদেশে চাকরি করতে যাওয়ার আগে প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক ধরনের প্রশিক্ষণ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে পেশাভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ, গন্তব্য দেশের ভাষা শিক্ষা, প্রাক্-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ।
এসব প্রস্তুতি বিদেশে গিয়ে কাজের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে সহায়তা করে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশগামী কর্মীদের গন্তব্য দেশের ভাষা শেখা এবং পছন্দ ও দক্ষতা অনুযায়ী কাজের প্রশিক্ষণ নেওয়া উচিত। এ জন্য বিএমইটির অধীনে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
১. পেশাভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ
বিদেশে যে কাজের জন্য যাবেন, সেই কাজের ওপর বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেই সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট হয় না; অনেক নিয়োগকর্তা নির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা ও সনদ দেখতে চান।
যেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া যেতে পারে-
- ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকসের কাজ
- প্লাম্বিং বা পাইপলাইন স্থাপন
- ওয়েল্ডিং
- রাজমিস্ত্রি ও নির্মাণকাজ
- টাইলস ও স্যানিটারি ফিটিং
- অটোমোবাইল মেকানিক ও অটো ইলেকট্রিশিয়ান
- এসি ও রেফ্রিজারেশন মেরামত
- কার্পেন্ট্রি বা কাঠের কাজ
- হোটেল ও রেস্টুরেন্ট ব্যবস্থাপনা
- হাউসকিপিং ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী
- ড্রাইভিং ও ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনা
২০২৫ সালের অক্টোবরে বিএমইটির তথ্যের বরাতে বাসস জানায়, বিদেশগামী কর্মীদের জন্য ২৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিভিন্ন পেশায় দক্ষতা যাচাই ও প্রশিক্ষণের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। এসব পেশার মধ্যে অটোমোবাইল, ইলেকট্রিক্যাল, ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং, নির্মাণকাজ ও এসি মেরামতের মতো কাজ রয়েছে।
২. গন্তব্য দেশের ভাষা শেখা
বিদেশে গিয়ে কর্মস্থলের নির্দেশনা বোঝা, সহকর্মী ও নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনে কথা বলার জন্য স্থানীয় ভাষা জানা অত্যন্ত উপকারী।
যেমন-
সৌদি আরব,কাতার,কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কাজের জন্য আরবি ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান।
- দক্ষিণ কোরিয়ায় কাজের জন্য কোরীয় ভাষা।
- জাপানে কাজের জন্য জাপানি ভাষা।
- মালয়েশিয়ায় কাজের জন্য মালয় ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান।
- ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা।
শুধু ভাষার সাধারণ জ্ঞান নয়, কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত নির্দেশনা, নিরাপত্তাসংক্রান্ত শব্দ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য চাওয়ার ভাষাও শেখা প্রয়োজন।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিএমইটির মাধ্যমে বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গন্তব্য দেশের ভাষা শেখার সুযোগ রয়েছে।
৩. তিন দিনের প্রাক্-বহির্গমন প্রশিক্ষণ
বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়া কর্মীদের জন্য প্রাক্-বহির্গমন প্রশিক্ষণ বা প্রি-ডিপারচার ওরিয়েন্টেশন (PDO) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএমইটির ব্যবস্থাপনায় সাধারণত তিন দিনের এই প্রশিক্ষণে বিদেশে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয় শেখানো হয়।
এ প্রশিক্ষণে সাধারণত যেসব বিষয় থাকে-
- বৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার নিয়ম।
- দালাল ও প্রতারক চক্র থেকে সতর্ক থাকার উপায়।
- চাকরির চুক্তিপত্র বোঝা ও যাচাই করা।
- বিদেশে কর্মীর অধিকার ও দায়িত্ব।
- গন্তব্য দেশের আইন-কানুন ও সামাজিক রীতিনীতি।
- বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেবা।
- কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা।
- দেশে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর নিয়ম।
- বিদেশে অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা সমস্যায় পড়লে করণীয়।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হলো বিদেশগামী কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন, কর্মপরিবেশ ও বিদেশে অবস্থানকালীন করণীয় সম্পর্কে প্রস্তুত করা।
৪. কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ
বিদেশে নির্মাণ,কারখানা,বিদ্যুৎ,ওয়েল্ডিং কিংবা ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। তাই কাজ শুরুর আগে নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রয়োজন।
এ ধরনের প্রশিক্ষণে শেখা উচিত-
- হেলমেট, গ্লাভস, সেফটি বুট ও অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার।
- বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এড়ানোর নিয়ম।
- আগুন লাগলে করণীয়।
- ভারী যন্ত্রপাতি নিরাপদে পরিচালনা।
- উচ্চতায় কাজ করার সতর্কতা।
- প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা।
বিশেষ করে নির্মাণশ্রমিক, ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার ও কারখানার কর্মীদের জন্য এসব প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
৫. নারী কর্মীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ
বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে যেতে আগ্রহী নারীদের জন্য কাজের ধরন অনুযায়ী বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এতে ঘর পরিষ্কার, রান্না, শিশু ও বয়স্কদের যত্ন, গৃহস্থালি সরঞ্জাম ব্যবহার এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়গুলো শেখানো হয়।
আরও পড়ুনঃ পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করতে কত টাকা লাগে? মেয়াদ কত দিন, জানুন আবেদন পদ্ধতি
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশগামী নারী গৃহকর্মীদের জন্য ২১ দিনের প্রশিক্ষণ কোর্স রয়েছে। একই সঙ্গে হংকংগামী নারী কর্মীদের জন্যও বিশেষ আবাসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা উল্লেখ করা হয়েছে।
নারীদের বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়োগকর্তা, কাজের ঠিকানা, বেতন, বিশ্রামের সময়, চুক্তির শর্ত এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার উপায় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া উচিত।
৬. আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল দক্ষতা
বিদেশে উপার্জিত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার এবং পরিবারের কাছে নিরাপদে পাঠানোর জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনা জানা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে যেসব বিষয় শেখা প্রয়োজন-
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা।
- বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে টাকা পাঠানো।
- মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা।
- বেতন থেকে সঞ্চয় করার কৌশল।
- প্রতারণামূলক ফোন, মেসেজ ও অনলাইন লিংক শনাক্ত করা।
- প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ।
বিদেশে নতুন পরিবেশে এসব দক্ষতা কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে পারে।
৭. কোথায় প্রশিক্ষণ নেবেন?
বিদেশগামী কর্মীদের জন্য সরকারি প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রতিষ্ঠান হলো জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। এর অধীনে দেশের বিভিন্ন স্থানে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC) ও ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (IMT) রয়েছে।
প্রশিক্ষণ ও কোর্সের তথ্য জানতে-
১. নিজ জেলার জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে (DEMO) যোগাযোগ করুন।
২. নিকটস্থ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (TTC) কোর্সের তালিকা সংগ্রহ করুন।
৩. গন্তব্য দেশ ও পেশা অনুযায়ী কোন প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তা জেনে নিন।
৪. বিএমইটির ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণের তথ্য দেখুন।
প্রয়োজনীয় ওয়েবসাইট:
- বিএমইটি: https://bmet.gov.bd
- ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম: https://www.oep.gov.bd
- প্রশিক্ষণসংক্রান্ত পোর্টাল: https://training.oep.gov.bd
৮. কোন দেশের জন্য কত দিনের প্রশিক্ষণ?
মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু কর্মীশ্রেণির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের মেয়াদ উল্লেখ রয়েছে।
- সৌদি আরবগামী কর্মীদের জন্য তিন দিনের প্রশিক্ষণ।
- দক্ষিণ কোরিয়াগামী কর্মীদের জন্য সাত দিনের প্রশিক্ষণ।
- বিদেশগামী নারী গৃহকর্মীদের জন্য ২১ দিনের প্রশিক্ষণ।
তবে প্রশিক্ষণের ধরন, মেয়াদ ও ভর্তি-সংক্রান্ত শর্ত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট TTC বা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস থেকে সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়া উচিত।
বিদেশে চাকরি করতে গিয়ে অনেক কর্মী ভাষাগত সমস্যা, কাজের দক্ষতার অভাব, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা কিংবা চুক্তির শর্ত না বোঝার কারণে বিপাকে পড়েন। আগে থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া থাকলে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তাই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই শুধু ভিসা ও টিকিটের প্রস্তুতি না নিয়ে নিজের পেশা, গন্তব্য দেশ এবং সম্ভাব্য কর্মপরিবেশ অনুযায়ী প্রশিক্ষণ নেওয়া উচিত।
দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে বিদেশে গেলে ভালো কাজ পাওয়ার সুযোগ বাড়ে এবং প্রবাসজীবনও তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হতে পারে।




একটি মন্তব্য