
কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকা শিশুদের মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। নারীদের ক্ষেত্রেও একই কারণ সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শিশুদের পাশাপাশি নারীদের মাদক ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধ্য করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সুযোগের অভাবকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির ধরনেও ভিন্নতা রয়েছে বলে একটি গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ১ হাজার ১৬ জনের মধ্যে ২৫৩ জন শুধু গাঁজা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের উপস্থিতি পল্টন ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বেশি পাওয়া গেছে।
শুধু ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ২৮৫ জন। তাঁদের বেশি দেখা গেছে কমলাপুর রেলস্টেশন ও বাড্ডা এলাকায়। গাঁজা ও ইয়াবা দুটোই বিক্রি করেন বলে জানিয়েছেন ২২৮ জন। তাঁদের মূলত ফার্মগেট ও তেজগাঁও এলাকায় বেশি পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ২৫০ জন গাঁজা ও হেরোইন দুটোই বিক্রির সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের উপস্থিতি বেশি ছিল সাভার ও পল্টন এলাকায়।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে ‘পারপাসিভ’ ও ‘স্নোবল স্যাম্পলিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের এলোমেলোভাবে নির্বাচন করা হয়নি। অবৈধ ও গোপন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পরিচিত ব্যক্তি ও বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ কারণে গবেষণার ফলাফলকে পুরো ঢাকা শহরের মাদক বিক্রেতাদের প্রতিনিধিত্বকারী পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন।
গবেষণাটিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শাফায়াত হোসেন। তাঁর সঙ্গে গবেষণায় ছিলেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষণা কেন্দ্র এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড প্র্যাকটিস ইনফরমেশন সেন্টারের গবেষক অধ্যাপক গ্যারেথ হল্যান্ড, সৌদি আরবের ইমাম মোহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটির বৈজ্ঞানিক গবেষণাসংক্রান্ত বিভাগের ডিন অধ্যাপক মো. আলামিন, চীনের চাংঝু ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. রোকনুজ্জামান, ঢাকার মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মাহদী হাসান এবং সিরাজগঞ্জের মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার।
ড. শাফায়াত হোসেন সমকালকে বলেন, গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ২৮ শতাংশের বয়স ১৫ বছর বা তার কম। তাঁর মতে, এই সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ঢাকার মাদক বাণিজ্যের কাঠামোয় শিশুশ্রমের মতো অপরাধমূলক শিশু শোষণ গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ১৫ বছর বা তার কম বয়সী শিশুরা সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহের বাইরে থাকে। এ কারণে মাদক সিন্ডিকেটগুলো এ বয়সী শিশুদের জোর করে অথবা বিভিন্ন কৌশলে কাজে ব্যবহার করছে। তাঁর মতে, বিষয়টি সমাজ ও রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যেরও প্রতিফলন।
মাদক ঢাকায় আসে যেসব পথে
গবেষণায় হেরোইন, গাঁজা ও ইয়াবা ঢাকায় প্রবেশের কয়েকটি আন্তঃসীমান্ত রুটের তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, হেরোইন মূলত পাকিস্তানের লাহোর থেকে ওয়াঘা সীমান্ত হয়ে ভারতের পাটনায় আসে। এরপর সেখান থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ঢাকায় পৌঁছানোর পর সাভার, মিরপুর, মহাখালী ও মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হেরোইন ছড়িয়ে পড়ে।
গাঁজার ক্ষেত্রে দুটি প্রধান প্রবেশপথ চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি রুট ভারত থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অন্যটি কুমিল্লা হয়ে আসে। দুটি পথই ঢাকায় এসে মিলিত হয়। এরপর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গাঁজা ছড়িয়ে পড়ে।
ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার। টেকনাফ সীমান্তের পাশাপাশি ভারতের মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ইয়াবা। এরপর একাধিক পথে সিলেট ও সুনামগঞ্জ হয়ে তা ঢাকায় আসে।
গবেষণায় মিয়ানমার থেকে মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে ইয়াবা আসার পথকে বৃহত্তর ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ মাদক পাচার নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব রুটে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল অঞ্চলের উৎপাদনকেন্দ্র থেকে সরাসরি ঢাকার বাজারে মাদক পৌঁছায়।
এ ছাড়া ভারত থেকে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশের আরও কয়েকটি পথের কথাও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রুটের মধ্যে রয়েছে জামালপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ।
গবেষণার মানচিত্রে তিনটি প্রধান আন্তঃসীমান্ত রুট আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে। এগুলো হলো পাকিস্তানের লাহোর থেকে ওয়াঘা ও পাটনা হয়ে বাংলাদেশ, ভারত থেকে মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার থেকে টেকনাফ হয়ে ঢাকা।
