
যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেতে বিদেশি কর্মীদের স্পনসর করার প্রক্রিয়া আরও কঠিন করে তুলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন কর্মীদের চাকরি সুরক্ষার যুক্তিতে দেশটির সরকার বিশ্বের কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এ সিদ্ধান্তে ভারতের শীর্ষস্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি কয়েকটি পশ্চিমা প্রযুক্তি কোম্পানিও প্রভাবিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমসচিব কিথ সান্ডারলিং এ সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন। স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে কগনিজেন্ট, ইনফোসিস, টাটা, উইপ্রো ও এইচসিএল। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে ক্যাপজেমিনি, মাইক্রোসফট ও অ্যাডোবির মতো পশ্চিমা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
ঘোষণার সময় শ্রমসচিবের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জালিয়াতিবিরোধী টাস্কফোর্সের প্রধান এবং দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
কিথ সান্ডারলিং বলেন, বিশ্বের বড় তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ও কাজের দায়িত্ব অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কগনিজেন্ট, ইনফোসিস, টাটা, উইপ্রো, এইচসিএল ও ক্যাপজেমিনির স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ স্থগিত করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন কোনো আবেদন আর গ্রহণ করা হবে না। একই সঙ্গে আগে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াকরণও বন্ধ থাকবে।
সান্ডারলিংয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৩০ লাখ বিদেশি কর্মীর জন্য আবেদন করেছে। এ পর্যন্ত তারা ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন এবং ১ লাখের বেশি স্থায়ী শ্রম সনদ পেয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান মার্কিন কর্মীদের কাছ থেকে লাখ লাখ চাকরির সুযোগ কেড়ে নিয়েছে।
স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচির মাধ্যমে নিয়োগকর্তারা বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী চাকরির জন্য স্পনসর করতে পারেন। এ প্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদনের পথও তৈরি করতে পারে।
মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে ভ্যান্সের অভিযোগ
মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি অভিবাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার করেছে।
ভ্যান্স বলেন, মাইক্রোসফট যুক্তরাষ্ট্রে পর্যাপ্ত যোগ্য কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না বলে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। অথচ ২০২৫ সালেই প্রতিষ্ঠানটি ৬ হাজার মার্কিন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করে। একই সময়ে মাইক্রোসফট ৬ হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন পায় এবং প্রায় ৩ হাজার ৬৮২টি স্থায়ী শ্রম সনদের আবেদন জমা দেয়। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার আবেদন ছিল চাকরিচ্যুত মার্কিন কর্মীদের একই ধরনের পদের জন্য।
বিদেশি কর্মী নিয়োগে কঠোর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
প্রতি বছর অনুমোদিত এইচ-১বি ভিসার বড় একটি অংশ পান ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীরা। মার্কিন নাগরিকদের চাকরি সুরক্ষার যুক্তিতে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে তুলনামূলক কম খরচে দক্ষ কর্মী নিয়োগ করা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে কাজের পরিবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
এর আগে গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি অ-অভিবাসী ভিসার জন্য ১ লাখ ডলার ফি আরোপসংক্রান্ত নির্বাহী আদেশের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়েছে।
ভ্যান্স এইচ-১বি ভিসার আওতায় নিয়োগ পাওয়া বিদেশি কর্মীদের ‘বিদেশি চুক্তিবদ্ধ চাকর’ বলে অভিহিত করেন। এ কর্মসূচি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনি ‘ভিসা কারখানা’ বলেও সমালোচনা করেন।
গবেষক ও শিক্ষার্থীদের স্পনসর করার ক্ষেত্রে জে-১ ভিসার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ভ্যান্স। তাঁর দাবি, গবেষক ও পণ্ডিতদের স্পনসর করা কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এই ভিসার অতিরিক্ত ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে মার্কিন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মজুরি কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ভ্যান্সের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মার্কিন কর্মী ও দেশটির জীবনধারার প্রতি মৌলিক অসম্মান। দক্ষ ও মেধাবী ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ দেওয়ার জন্য তৈরি ভিসা কর্মসূচিকে স্থানীয় কর্মীদের মজুরি কমানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে মাইক্রোসফট, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে না বলেও অভিযোগ করেন ভ্যান্স। তাঁর দাবি, নিয়ম অনুযায়ী বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য শ্রম বিভাগে আবেদন করার আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট পদের বিজ্ঞাপন দিতে হয়।
ভ্যান্স অভিযোগ করেন, কিছু প্রতিষ্ঠান ছোট শহরের সংবাদপত্রে চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। পরে তারা দাবি করে, বিজ্ঞাপন দেওয়ার পরও ওই পদে কেউ আবেদন করেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আবেদন না পাওয়ার এই যুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন কর্মীদের জায়গায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে।
নাসকমের প্রতিক্রিয়া
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংগঠন নাসকম জানিয়েছে, দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে।
এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি অভিবাসনের একটি নির্দিষ্ট পথকে প্রভাবিত করেছে। তবে অভিবাসন এবং দক্ষ কর্মীদের আন্তর্জাতিক চলাচল দুটি আলাদা বিষয়। এগুলোকে একইভাবে বিবেচনা করা উচিত নয় বলে মনে করে নাসকম।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রাখছে এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি। ভবিষ্যতেও এর ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। তবে গত কয়েক বছরে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এ ভিসার ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে এবং শক্তিশালী নিজস্ব কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছে।
নাসকমের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ফরচুন ৫০০ তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির সঙ্গে কাজ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন ও ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করার পাশাপাশি তারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় পর্যায়ে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখছে।



