সারা দেশে গ্যাস বন্ধের গুজব! আসলে কী ঘটছে, জানাল পেট্রোবাংলা

দেশে টানা ৪ দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বুধবার থেকে গ্যাস পাওয়া যাবে না, এমন প্রচারণায় অনেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।
তবে সারা দেশে ৪ দিন গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রাখার কোনো সরকারি ঘোষণা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)।
সংস্থাটির দাবি, গ্যাস বন্ধের খবরটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। তবে একটি এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণকাজের কারণে কয়েক দিন গ্যাসের সরবরাহ কমতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে এলএনজি সরবরাহ সাময়িক বন্ধ রাখার একটি ঘোষণা।
পেট্রোবাংলা গত ১ নভেম্বর বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, জরুরি রক্ষণাবেক্ষণকাজের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত সামিটের ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল থেকে সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে।
এই ঘোষণার পর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে সেই খবরের একাংশ ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারা দেশে ৪ দিন গ্যাস বন্ধ থাকার প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে।
বিষয়টি পেট্রোবাংলার নজরে আসার পর মঙ্গলবার সংস্থাটি একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগামী চার দিন দেশে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে—এমন দাবি করে একটি মহল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড তৈরি করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা স্পষ্ট করেছে, সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে না। তবে সামিটের এলএনজি টার্মিনালে রক্ষণাবেক্ষণকাজের কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যেতে পারে।
এ কারণে গ্রাহকদের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের মোট সরবরাহ প্রায় ২৫৭ কোটি ঘনফুট। সামিটের টার্মিনালে রক্ষণাবেক্ষণকাজ চলাকালে এই সরবরাহ কমে প্রায় ২২৫ কোটি ঘনফুটে নেমে আসতে পারে।
অর্থাৎ, প্রতিদিন প্রায় ৩২ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমার আশঙ্কা রয়েছে।
এলএনজি থেকে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৯২ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণকাজের সময় তা কমে প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসতে পারে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে বুধবার সকাল ৮টা থেকে ৭ নভেম্বর বিকেল ৪ টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে।
গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের বিভিন্ন খাতে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট।
এই সরবরাহের মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসছে প্রায় ১৬০ কোটি ঘনফুট। বাকি অংশের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে আমদানি করা এলএনজি থেকে।
ফলে একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে শিল্পকারখানার উৎপাদন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম এবং বাসাবাড়ির রান্নার কাজে।
তবে কোন এলাকায় কতটা চাপ কমবে, তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি পেট্রোবাংলা।
বাংলাদেশে আমদানি করা এলএনজি তরল অবস্থা থেকে গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় পাইপলাইনে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে।
এই টার্মিনালগুলোকে বলা হয় ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ।
দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে এ দুটি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯২ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
এর মধ্যে সামিটের টার্মিনালে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণকাজের জন্য নির্ধারিত সময় পর্যন্ত রিগ্যাসিফিকেশন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হবে।
এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরেও সামিটের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ রেখে একই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণকাজ করা হয়েছিল। সে সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।
এবারও একই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণকাজের কারণে সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া চার দিন সারা দেশে গ্যাস বন্ধ থাকার খবর সঠিক নয়। তবে একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমবে এবং কিছু এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ দেখা দিতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।



