
ডায়াবেটিস নিয়ে সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে হলে খাবার নির্বাচনে সচেতন হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে শুধু চিনি এড়িয়ে চলাই যথেষ্ট নয়, বরং সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন খনিজসমৃদ্ধ খাবার পরিমিত পরিমাণে খাওয়া প্রয়োজন।
এমন একটি খনিজ হলো ক্রোমিয়াম। শরীরে অল্প পরিমাণে প্রয়োজন হয় বলে একে স্বল্পমাত্রার খনিজ বলা হয়। ইনসুলিনের কার্যক্রমে ক্রোমিয়ামের ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ইনসুলিন শরীরের কোষে গ্লুকোজ প্রবেশ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে ক্রোমিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খেলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। রক্তে শর্করার ওপর ক্রোমিয়াম গ্রহণের প্রভাব নিয়ে গবেষণার ফলও একরকম নয়। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নির্ধারিত ওষুধের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ক্রোমিয়ামসমৃদ্ধ যেসব খাবার খেতে পারেন
ক্রোমিয়াম গ্রহণের জন্য বিশেষ কোনো দামি খাবারের প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকা বিভিন্ন খাবার থেকেও এই খনিজ পাওয়া যায়। তবে খাবারে ক্রোমিয়ামের পরিমাণ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রান্নার পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
১. ব্রোকলি
ব্রোকলি পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি সবজি। এতে ক্রোমিয়ামের পাশাপাশি খাদ্যআঁশ, বিভিন্ন ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। দুপুর বা রাতের খাবারের সঙ্গে সেদ্ধ বা হালকা রান্না করা ব্রোকলি খেলে খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর সবজির পরিমাণ বাড়ে।
এর খাদ্যআঁশ হজমে সহায়তা করে এবং খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার সামগ্রিক প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু ব্রোকলি খাওয়ার মাধ্যমে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমনটি বলা যায় না।
২. পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার
ওটস, লাল চাল ও বার্লির মতো পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার খাদ্যআঁশের ভালো উৎস। এসব খাবারে ক্রোমিয়ামও থাকতে পারে। সাদা চাল ও পরিশোধিত ময়দার পরিবর্তে পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার বেছে নিলে খাদ্যতালিকায় আঁশের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব।
খাদ্যআঁশসমৃদ্ধ খাবার হজমের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এবং কার্বোহাইড্রেট থেকে গ্লুকোজ শরীরে প্রবেশের গতি ধীর করতে সহায়তা করতে পারে। এতে খাবারের পর রক্তে শর্করার আকস্মিক বৃদ্ধি কিছুটা কমতে পারে।
তবে লাল চাল, ওটস বা অন্য কোনো শস্যজাতীয় খাবার খেলেও পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। কারণ এসব খাবারেও কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা রক্তে শর্করার মাত্রাকে প্রভাবিত করে।
৩. চর্বিহীন মাংস
মুরগি ও টার্কির মতো চর্বিহীন মাংস প্রোটিনের ভালো উৎস। এসব খাবারে কিছু পরিমাণ ক্রোমিয়ামও থাকতে পারে। প্রোটিন শরীরের পেশি ও অন্যান্য টিস্যু গঠনে সহায়তা করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতেও ভূমিকা রাখে।
ডায়াবেটিসের খাদ্যতালিকায় মুরগির মাংস রাখতে চাইলে চামড়া ছাড়িয়ে রান্না করা এবং অতিরিক্ত তেল ও লবণ এড়িয়ে চলা ভালো। ভাজা বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংসের পরিবর্তে সেদ্ধ, ঝোল বা গ্রিল করা মাংস বেছে নেওয়া যেতে পারে।
৪. ডিম
ডিম প্রোটিনের সহজলভ্য উৎস। এতে অল্প পরিমাণে ক্রোমিয়ামও রয়েছে। ডিমে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কম থাকায় এটি সাধারণত রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ায় না।
সকালের নাশতায় সেদ্ধ ডিম খাওয়া যেতে পারে। এর প্রোটিন পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে মিলিয়ে একটি সুষম নাশতা তৈরি করা যায়। তবে ডিম কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত তেল, মাখন বা লবণ ব্যবহার না করাই ভালো।
৫. বাদাম ও বীজ
আমন্ড, আখরোট ও সূর্যমুখীর বীজে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি কিছু পরিমাণ ক্রোমিয়াম থাকতে পারে। এগুলোতে স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন ও খাদ্যআঁশও রয়েছে।
সকালের নাশতা ও দুপুরের খাবারের মধ্যবর্তী সময়ে কিংবা সন্ধ্যায় ক্ষুধা লাগলে অল্প পরিমাণ বাদাম ও বীজ খাওয়া যেতে পারে। এতে পেট ভরা রাখতে সহায়তা মিলতে পারে এবং খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর চর্বি যুক্ত হয়।
তবে বাদাম ও বীজে ক্যালরির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তাই পরিমিত পরিমাণে খাওয়া এবং অতিরিক্ত লবণ বা চিনি মেশানো বাদাম এড়িয়ে চলা ভালো।
৬. সামুদ্রিক খাবার
বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক খাবার, বিশেষ করে কিছু শেলফিশে ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। মাছ ও নির্দিষ্ট কিছু সামুদ্রিক খাবার প্রোটিনেরও ভালো উৎস। তৈলাক্ত সামুদ্রিক মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হয়। তাই খাদ্যতালিকায় উপযুক্ত মাছ ও সামুদ্রিক খাবার রাখা উপকারী হতে পারে। তবে সব ধরনের সামুদ্রিক খাবারে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ সমান নয়। শেলফিশ ও তৈলাক্ত মাছের পুষ্টিগুণেও পার্থক্য রয়েছে।
সামুদ্রিক খাবার রান্নার সময় অতিরিক্ত লবণ, তেল ও ভাজার ব্যবহার কমানো ভালো। যাঁদের সামুদ্রিক খাবারে অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের এসব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
খাদ্যতালিকায় ক্রোমিয়ামসমৃদ্ধ খাবার যোগ করবেন যেভাবে
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিদিনের খাবারে কয়েকটি সহজ পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
- সাদা চাল ও পরিশোধিত শস্যের কিছু অংশের পরিবর্তে লাল চাল, ওটস বা অন্যান্য পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার বেছে নিন।
- দুপুর ও রাতের খাবারে ব্রোকলিসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি রাখুন।
- সকালের নাশতায় সেদ্ধ ডিমের সঙ্গে শাকসবজি ও পরিমিত পরিমাণে পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার খেতে পারেন।
- ক্ষুধা লাগলে অতিরিক্ত লবণ ও চিনি ছাড়া অল্প পরিমাণ বাদাম ও বীজ খান।
- খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানানসই হলে সপ্তাহে এক বা দুই দিন মাছ বা অন্যান্য সামুদ্রিক খাবার রাখতে পারেন।
- প্রতিবার খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখুন এবং খাদ্যতালিকায় শাকসবজি ও উপযুক্ত প্রোটিনের ভারসাম্য বজায় রাখুন।
ক্রোমিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে সতর্কতা জরুরি
ক্রোমিয়াম শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি খনিজ হলেও অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলেই বেশি উপকার পাওয়া যায়, এমন নয়। ক্রোমিয়াম সাপ্লিমেন্ট রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে গবেষণায় এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজে থেকে উচ্চমাত্রার ক্রোমিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
বিশেষ করে কিডনি বা যকৃতের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা থাকলে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো সাপ্লিমেন্ট শুরু করা ঠিক নয়। কারণ সাপ্লিমেন্ট ও ওষুধের পারস্পরিক প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়।
সব মিলিয়ে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোনো একটি খনিজ বা বিশেষ খাবারের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখা এবং পরিমিত খাবার খাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে সহায়তা করে।



