
ত্বকের যত্নে প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার নতুন নয়। এর মধ্যে চাল ভেজানো পানি বা রাইস ওয়াটার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই ত্বক নরম ও উজ্জ্বল দেখানোর আশায় এটি মুখে টোনার হিসেবে ব্যবহার করেন। চাল পানিতে ভিজিয়ে বা সেদ্ধ করে সহজেই এই তরল তৈরি করা যায়। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সৌন্দর্যচর্চার অংশ হিসেবেও এর ব্যবহার রয়েছে।
তবে প্রতিদিন মুখে রাইস ওয়াটার ব্যবহার করলেই কি ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়? চাল থেকে পাওয়া কিছু উপাদান ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং এর সুরক্ষাস্তর ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু ঘরে তৈরি রাইস ওয়াটার ব্যবহারের উপকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনো সীমিত। কীভাবে এটি তৈরি করা হচ্ছে, কতক্ষণ ত্বকে রাখা হচ্ছে এবং ত্বকের ধরন কেমন, তার ওপরও এর প্রভাব নির্ভর করতে পারে।
রাইস ওয়াটার কী, ত্বকের যত্নে কেন ব্যবহার করা হয়?
চাল ধোয়া, ভিজিয়ে রাখা বা সেদ্ধ করার পর যে শ্বেতসারযুক্ত পানি পাওয়া যায়, সেটিই রাইস ওয়াটার নামে পরিচিত। তৈরির পদ্ধতি অনুযায়ী এতে অল্প পরিমাণে শ্বেতসার, অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকতে পারে।
জার্নাল অব কসমেটিক ডার্মাটোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় চাল থেকে পাওয়া উপাদানের ত্বকের যত্নে সম্ভাব্য উপকারিতার কথা উঠে এসেছে। এ ধরনের কিছু উপাদান প্রসাধনসামগ্রী তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়। এগুলো ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং ত্বকের সুরক্ষাস্তর মজবুত করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে ঘরে তৈরি রাইস ওয়াটার আর চালের নির্যাস ব্যবহার করে বিশেষভাবে তৈরি প্রসাধনসামগ্রী এক নয়। দুটির উপাদান ও ঘনত্বে পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে প্রসাধনসামগ্রীতে চালের নির্যাসের উপকারিতা নিয়ে পাওয়া তথ্য ঘরে তৈরি রাইস ওয়াটারের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য হবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সাধারণত মুখের টোনার, মুখ ধোয়ার তরল কিংবা ঘরে তৈরি ফেস মাস্কের উপাদান হিসেবে রাইস ওয়াটার ব্যবহার করা হয়। ত্বকের মসৃণতা বাড়ানো, নিষ্প্রভ ভাব কমানো এবং মুখে উজ্জ্বলতা আনার আশায় অনেকে এটি ব্যবহার করেন। তবে নিয়মিত ব্যবহারে বাস্তবে কী ধরনের পরিবর্তন হতে পারে, তা জানা জরুরি।
ত্বক সাময়িকভাবে নরম হতে পারে
রাইস ওয়াটারে থাকা শ্বেতসার ত্বকের ওপর হালকা একটি আস্তরণ তৈরি করতে পারে। এর ফলে ত্বক কিছু সময়ের জন্য মসৃণ ও নরম অনুভূত হতে পারে। তবে ত্বক নরম লাগলেই যে এর আর্দ্রতার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তা বলা যায় না।
ত্বক শুষ্ক হলে আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা বেশি নির্ভরযোগ্য উপায়। তাই শুধু রাইস ওয়াটারের ওপর নির্ভর না করে ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।
ত্বক উজ্জ্বল দেখাতে পারে, তবে প্রমাণ সীমিত
ত্বকের নিষ্প্রভ ভাব কমাতে রাইস ওয়াটারকে প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে প্রচার করা হয়। এটি ব্যবহারের পর ত্বক সাময়িকভাবে মসৃণ ও আর্দ্র দেখাতে পারে। এতে মুখের চেহারায় কিছুটা সতেজ ভাব আসতে পারে।
তবে ঘরে তৈরি রাইস ওয়াটার নিয়মিত ব্যবহার করলে ত্বকের উজ্জ্বলতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ে বা দীর্ঘস্থায়ী আভা তৈরি হয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এটি ত্বকের স্বাভাবিক রং বদলে দেবে বা ত্বকের কালচে দাগ দূর করবে, এমন প্রত্যাশাও করা উচিত নয়।
ত্বকের সুরক্ষাস্তর ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে
ত্বকের সুরক্ষাস্তর শরীরের ভেতরের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে বাইরের পরিবেশের বিভিন্ন উত্তেজক উপাদান থেকেও ত্বককে সুরক্ষা দেয়। কসমেটিকস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, চাল থেকে পাওয়া কিছু উপাদানে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং সুরক্ষাস্তর শক্তিশালী করার সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
এসব উপাদান ত্বককে আরাম দিতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে হালকা অস্বস্তিও কম মনে হতে পারে। তবে রাইস ওয়াটার সবার ত্বকে একইভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ত্বকের লালচে ভাব বা প্রদাহ কমাতে ঘরে তৈরি রাইস ওয়াটারের কার্যকারিতাও এখনো যথেষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
মুখে রাইস ওয়াটার ব্যবহারের নিয়ম
ঘরে রাইস ওয়াটার তৈরি করতে প্রথমে চাল ভালোভাবে ধুয়ে নিন। এরপর পরিষ্কার একটি পাত্রে চাল নিয়ে তাতে পরিষ্কার পানি দিন। ১৫ থেকে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখার পর পরিষ্কার পাত্র ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে চাল থেকে পানি আলাদা করুন।
মুখ পরিষ্কার করার পর পরিষ্কার হাত বা তুলার প্যাড দিয়ে অল্প পরিমাণ রাইস ওয়াটার লাগাতে পারেন। ব্যবহারের সময় চোখের আশপাশ এড়িয়ে চলুন। ত্বক আঠালো মনে হলে বা অস্বস্তি হলে সাধারণ পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এরপর ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
দিনের বেলায় বাইরে গেলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বক রক্ষায় এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত। রাইস ওয়াটার সানস্ক্রিনের বিকল্প নয়।
ত্বকে কোনো উপাদান ব্যবহারের পর চুলকানি, জ্বালাপোড়া বা লালচে ভাব দেখা দিলে তা ব্যবহার বন্ধ করুন। ঘরে তৈরি রাইস ওয়াটার দীর্ঘ সময় রেখে দিলে দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পরিষ্কার পাত্রে তৈরি করা এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ না করাই ভালো।



