
বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারের প্রতিদিনের খাবারে ভাত থাকে। তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা যাঁদের এ রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের অনেককেই সাদা চালের পরিবর্তে লাল চাল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ, লাল চালের বাইরের স্তরে আঁশ বেশি থাকে। কিন্তু লাল চাল খেলেই কি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চালের রং নয়, ভাতের পরিমাণ, খাবারের ধরন এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থাও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লাল চাল সাধারণত সাদা চালের তুলনায় বেশি আঁশ সরবরাহ করে। চালের বাইরের তুষের স্তর অক্ষত থাকায় এতে আঁশের পাশাপাশি কিছু ভিটামিন ও খনিজ উপাদানও থাকে। এ কারণে খাদ্যতালিকায় আঁশের পরিমাণ বাড়াতে লাল চাল ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে সাদা ও লাল, দুই ধরনের চালেই শর্করা থাকে। তাই লাল চাল খেলেও অতিরিক্ত ভাত খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
২০২১ সালে পিয়ারজে সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় প্রিডায়াবেটিস বা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর লাল চাল খাওয়ার প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, সাদা চালের পরিবর্তে লাল চাল খেলে খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রক্তে শর্করার গড় নির্দেশক এইচবিএ১সি-তে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি। এ বিষয়ে আরও উন্নত মানের ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন গবেষকেরা।
এর অর্থ এই নয় যে লাল চালের পুষ্টিগুণ নেই। বরং শুধু সাদা চালের পরিবর্তে লাল চাল খাওয়াই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। এর সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের অন্যান্য দিকও বিবেচনায় রাখতে হবে।
সাদা ভাত খেলে কি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে?
নিয়মিত বেশি পরিমাণে সাদা ভাত খাওয়া, বিশেষ করে আঁশ কম এমন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
২০২২ সালে বিএমজে ওপেন সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ভাত খাওয়ার সঙ্গে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা ও চিকিৎসা পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। এতে বেশি পরিমাণে সাদা ভাত খাওয়ার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া যায়। অন্যদিকে, লাল চাল খাওয়ার সঙ্গে ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে চিকিৎসা পরীক্ষাগুলোতে লাল চাল খাওয়ার পর হৃদ্যন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সূচকগুলোর ধারাবাহিক উন্নতি পাওয়া যায়নি।
এ ধরনের গবেষণায় কোনো খাবার খাওয়ার সঙ্গে রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, তা দিয়ে সরাসরি প্রমাণ করা যায় না যে ওই খাবারই রোগটির কারণ। সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে প্রভাব ফেলে।
ডায়াবেটিস থাকলে কতটা ভাত খাওয়া উচিত?
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত সবার জন্য ভাতের নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ উপযুক্ত, এমন নয়। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন, ওষুধ এবং রক্তে শর্করার অবস্থার ওপর প্রয়োজনীয় খাবারের পরিমাণ নির্ভর করে। তাই ডায়াবেটিস থাকলেই ভাত পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং খাবারে শাকসবজি ও প্রোটিনের ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি।
খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে:
- খাবারের প্লেটের অধিকাংশ অংশ ভাত দিয়ে পূর্ণ না করে পরিমিত পরিমাণে ভাত নিন।
- ভাতের সঙ্গে ডাল, শিম, ডিম, মাছ, পনির বা অন্য কোনো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন।
- পালংশাক, বাঁধাকপি, শিম ও লাউয়ের মতো শ্বেতসার কম এমন সবজি খাবারে যোগ করুন।
- চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করুন।
আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের স্বাস্থ্যকর খাবারের নির্দেশিকায় প্লেট পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে প্লেটের অর্ধেক অংশে শ্বেতসার কম এমন সবজি, এক-চতুর্থাংশে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং বাকি এক-চতুর্থাংশে ভাতসহ শর্করাজাতীয় খাবার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখার একটি কার্যকর উপায়। তবে ব্যক্তিভেদে খাবারের চাহিদা আলাদা হতে পারে।
ভাত ঠান্ডা করে খেলে কি রক্তে শর্করা কম বাড়ে?
ভাত রান্না করার পর ঠান্ডা করলে এতে প্রতিরোধী শ্বেতসারের পরিমাণ বাড়তে পারে। এই শ্বেতসার সাধারণ শ্বেতসারের মতো সহজে হজম হয় না। ফলে কিছু পরিস্থিতিতে এটি খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের বৃদ্ধি কমাতে পারে। তবে এর প্রভাব সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। ভাত ঠান্ডা করলেও এর শর্করা পুরোপুরি দূর হয়ে যায় না। তাই এ পদ্ধতিকে পরিমিত পরিমাণে ভাত খাওয়ার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
এ ছাড়া রান্না করা ভাত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ভাত রান্নার পর দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখতে হবে। দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা উচিত নয়। খাওয়ার আগে ভালোভাবে গরম করে নিতে হবে।
ডায়াবেটিস থাকলেও কি সাদা ভাত খাওয়া যায়?
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাদা ভাত পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন নয়। পরিমিত পরিমাণে সাদা ভাতও সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা, সঙ্গে প্রোটিন ও সবজি খাওয়া এবং খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজের প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করা জরুরি।
লাল চাল খাদ্যতালিকায় আঁশ বাড়ানোর একটি উপায়। তবে এটিই একমাত্র বিকল্প নয়। অন্যান্য গোটা শস্য, ডাল ও শাকসবজিও খাবারের পুষ্টিমান বাড়াতে সাহায্য করে।
সব মিলিয়ে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে শুধু সাদা চালের বদলে লাল চাল বেছে নেওয়াই যথেষ্ট নয়। কোন চাল খাওয়া হচ্ছে, তার পাশাপাশি কতটা খাওয়া হচ্ছে এবং পুরো দিনের খাদ্যাভ্যাস কেমন, সেদিকেও নজর দিতে হবে। ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ঠিক করতে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে ভালো।



