
সকালের নাশতায় ডিম অনেকেরই পছন্দের খাবার। সহজে রান্না করা যায়, ভালো মানের প্রোটিন পাওয়া যায় এবং দিনের বিভিন্ন খাবারের সঙ্গেও ডিম খাওয়া যায়। তবে ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল থাকায় এটি নিয়মিত খাওয়া নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে। কেউ কুসুম বাদ দিয়ে শুধু সাদা অংশ খান, আবার কেউ প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে একাধিক ডিম খান। তাহলে প্রতিদিন ডিম খাওয়া কতটা নিরাপদ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন ডিম খাওয়া নিরাপদ হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, ডিম খাওয়ার পরিমাণ এবং রান্নার পদ্ধতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
প্রতিদিন ডিম খাওয়া কি স্বাস্থ্যকর?
ডিম ভালো মানের প্রোটিনের পাশাপাশি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। এতে রয়েছে ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম ও কোলিন। এ ছাড়া ডিমের কুসুমে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন নামের উপাদান থাকে, যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
তবে ডিমকে আলাদা করে বিবেচনা না করে প্রতিদিনের সামগ্রিক খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের খাদ্যতালিকাবিষয়ক নির্দেশিকায় কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবারের পরিবর্তে হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকারী সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডিম খাওয়ার স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণার ফলও পুরোপুরি একরকম নয়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ১৪টি মেটা-বিশ্লেষণের ফল পর্যালোচনা করা হয়। এতে ডিম খাওয়ার সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত ফলাফলের সম্পর্ক নিয়ে পাওয়া প্রমাণের মধ্যে যথেষ্ট সামঞ্জস্য ছিল না। প্রমাণের মানও ছিল দুর্বল। ফলে ডিম খাওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ গবেষকেরা পাননি।
দিনে কয়টি ডিম খাওয়া যায়?
সবার জন্য প্রযোজ্য এমন কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক দিনে একটি গোটা ডিম খাওয়ার মাধ্যমে শুরু করতে পারেন। তবে ব্যক্তির পুষ্টির চাহিদা, শারীরিক পরিশ্রম এবং অন্যান্য খাবারের ওপর নির্ভর করে ডিম খাওয়ার পরিমাণে পার্থক্য হতে পারে। যাঁরা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন বা যাঁদের প্রোটিনের চাহিদা বেশি, তাঁদের খাদ্যতালিকাও সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
২০২২ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা ২৪টি গবেষণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এতে প্রতিদিন ডিম খাওয়ার সংখ্যা এবং যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি সামান্য বেড়ে যাওয়ার মধ্যে একটি সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে এ সম্পর্ক কিছু নির্দিষ্ট উপগোষ্ঠীতে দেখা গেছে। পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণায় এমন সম্পর্ক পাওয়া গেলেই ডিম খাওয়ার কারণে মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে, তা প্রমাণিত হয় না।
তাই গবেষণার ফলাফল এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। সবার জন্য প্রতিদিন একাধিক ডিম খাওয়ার সুপারিশ করার মতো নিশ্চিত প্রমাণও নেই। ডিমের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাস বিবেচনা করা উচিত।
ডিম কি রক্তে কোলেস্টেরল বাড়ায়?
ডিমের কুসুমে খাদ্যজাত কোলেস্টেরল থাকে। তবে খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা কোলেস্টেরল এবং রক্তে থাকা কোলেস্টেরল এক বিষয় নয়। ডিম খেলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কতটা পরিবর্তিত হবে, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে খাদ্যতালিকায় সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ, বংশগত বৈশিষ্ট্য, আগে থেকে থাকা কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসেরও ভূমিকা রয়েছে।
২০২৫ সালে নিউট্রিশনাল মেটাবলিজম অ্যান্ড কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজেস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনার কিছু বিশ্লেষণে ডিম খাওয়ার সঙ্গে রক্তে ক্ষতিকর হিসেবে পরিচিত এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে পর্যালোচনার লেখকেরা সামগ্রিক প্রমাণকে অত্যন্ত দুর্বল বলে মূল্যায়ন করেছেন। অর্থাৎ, প্রতিদিন ডিম খেলেই সবার রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যথেষ্ট ভিত্তি নেই।
যাঁদের রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি, বংশগতভাবে কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে কিংবা আগে থেকেই হৃদ্রোগ আছে, তাঁদের ডিম খাওয়ার পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডিমের সাদা অংশ, নাকি পুরো ডিম?
ডিমের সাদা অংশ ও কুসুমে পুষ্টির ধরন আলাদা। সাদা অংশে ভালো মানের প্রোটিন রয়েছে, তবে এতে খাদ্যজাত কোলেস্টেরল থাকে না। অন্যদিকে, পুরো ডিম থেকে প্রোটিনের পাশাপাশি কুসুমে থাকা কোলিন, ভিটামিন বি১২সহ বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান পাওয়া যায়।
যাঁরা খাদ্যজাত কোলেস্টেরল কম রেখে বেশি প্রোটিন পেতে চান, তাঁরা একটি গোটা ডিমের সঙ্গে অতিরিক্ত সাদা অংশ খেতে পারেন। তবে পুরো ডিম খাবেন, নাকি শুধু সাদা অংশ, তা নির্ভর করবে ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা, পুষ্টির চাহিদা ও সামগ্রিক খাদ্যতালিকার ওপর।
ডিম রান্নার পদ্ধতিও কি গুরুত্বপূর্ণ?
ডিম কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, তার ওপরও খাবারটির সামগ্রিক পুষ্টিগুণ নির্ভর করে। রান্নায় ব্যবহৃত মাখন, তেল, পনির এবং প্রক্রিয়াজাত মাংসের পরিমাণ খাবারে চর্বি ও অন্যান্য উপাদানের পরিমাণ বাড়াতে পারে।
ডিম সেদ্ধ বা পোচ করে অতিরিক্ত চর্বি ছাড়াই খাওয়া যায়। আবার পরিমিত তেল দিয়ে ভাজা বা ফেটিয়ে রান্না করা ডিমও সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। মূল বিষয় হলো, রান্নায় কী কী উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সেগুলোর পরিমাণ কত।
ডিমের সঙ্গে শাকসবজি, আস্ত শস্যের তৈরি পাউরুটি কিংবা আঁশসমৃদ্ধ অন্য খাবার খাওয়া ভালো অভ্যাস। অন্যদিকে, অতিরিক্ত মাখন, বেশি পনির ও প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার পরিমাণ কমানো উচিত। বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কারা প্রতিদিন ডিম খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকবেন?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ডিম খাওয়ার পরিমাণ নির্ধারণে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। যাঁদের রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি কিংবা হৃদ্রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা ঠিক করা উচিত।
ডিমে অ্যালার্জি থাকলে তা এড়িয়ে চলতে হবে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও শুধু ডিমের মতো একটি খাবারের ওপর মনোযোগ না দিয়ে পুরো খাদ্যতালিকা, খাবারের পরিমাণ ও পুষ্টির ভারসাম্য বিবেচনা করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, ডিমকে সবার জন্য ক্ষতিকর বা সবার জন্য সমান উপকারী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নিয়মিত ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য, পরিমাণ, রান্নার পদ্ধতি এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ভারসাম্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



