অন্য খবর

বারবার গলা পরিষ্কার করেন? এর পেছনে থাকতে পারে যে ৫ কারণ

মাঝেমধ্যে গলা পরিষ্কার করা স্বাভাবিক। খাওয়ার পর, ঘুম থেকে ওঠার সময় কিংবা দীর্ঘক্ষণ কথা বলার পর গলায় অস্বস্তি হলে অনেকেই গলা খাঁকারি দেন। তবে অসুস্থ না থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি সারা দিন বারবার গলা পরিষ্কার করতে থাকেন, তাহলে এর পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে।

অ্যাসিড রিফ্লাক্স, অ্যালার্জি, নাকের শ্লেষ্মা গলার পেছনে নেমে আসা কিংবা আগে হওয়া কোনো সংক্রমণের কারণে এমন অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। আবার কখনো মূল সমস্যাটি সেরে যাওয়ার পরও গলা পরিষ্কার করার তাগিদ থেকে যায়। কিছু ক্ষেত্রে বারবার গলা পরিষ্কার করার অভ্যাসই অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়। ফলে তৈরি হয় এমন এক চক্র, যা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হতে পারে।

কেন বারবার গলা পরিষ্কার করতে হয়?

গলা পরিষ্কার করার পেছনে সাধারণত কোনো না কোনো কারণ থাকে। সেটি হতে পারে অ্যাসিড রিফ্লাক্স, অ্যালার্জি, নাক থেকে শ্লেষ্মা গলার পেছনে নেমে আসা কিংবা ভাইরাসের সংক্রমণ। তবে একবার গলা পরিষ্কার করলেই যে অস্বস্তির মূল কারণ দূর হয়ে যায়, তা নয়।

বরং বারবার গলা পরিষ্কার করলে গলার সংবেদনশীল টিস্যুতে আরও জ্বালা সৃষ্টি হতে পারে। এতে গলায় অস্বস্তি বাড়ে এবং আবারও গলা পরিষ্কার করার তাগিদ তৈরি হয়। এভাবে জ্বালা, অস্বস্তি, গলা পরিষ্কার করার তাগিদ এবং পুনরায় গলা পরিষ্কার করার একটি চক্র চলতে থাকে।

গলা পরিষ্কার করার তাগিদের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।

১. সাইলেন্ট রিফ্লাক্স

ল্যারিঙ্গোফ্যারিঞ্জিয়াল রিফ্লাক্স, যা সাইলেন্ট রিফ্লাক্স নামেও পরিচিত, এমন একটি অবস্থা, যখন পাকস্থলীর উপাদান গলা বা স্বরযন্ত্র পর্যন্ত উঠে আসে। সাধারণ অ্যাসিড রিফ্লাক্সের ক্ষেত্রে বুকজ্বালা দেখা গেলেও সাইলেন্ট রিফ্লাক্সে তা নাও হতে পারে।

এ অবস্থায় বারবার গলা পরিষ্কার করা, কাশি, কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া কিংবা গলায় শ্লেষ্মা জমে থাকার মতো অনুভূতি হতে পারে।

তবে গলার প্রতিটি সমস্যার জন্য রিফ্লাক্সকে দায়ী করা ঠিক নয়। ২০২৪ সালে অ্যালিমেন্টারি ফার্মাকোলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিকস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ল্যারিঙ্গোফ্যারিঞ্জিয়াল রিফ্লাক্স শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। কারণ, বারবার গলা পরিষ্কার করার মতো উপসর্গ অন্যান্য সমস্যার কারণেও দেখা দেয়।

এ রোগ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে একক কোনো পরীক্ষা সব সময় নিশ্চিত ফল দেয় না। তাই চিকিৎসকদের রিফ্লাক্সের পাশাপাশি গলার অতিসংবেদনশীলতা কিংবা বারবার গলা পরিষ্কার করার অভ্যাসও বিবেচনায় নিতে হয়।

২. পোস্টন্যাসাল ড্রিপ

অ্যালার্জি কিংবা নাকের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে নাকের শ্লেষ্মা গলার পেছনের দিকে নেমে আসতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে পোস্টন্যাসাল ড্রিপ বলা হয়।

এর ফলে গলার পেছনে কিছু জমে থাকার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। তখন বারবার গলা পরিষ্কার করার প্রয়োজন হচ্ছে বলে মনে হয়। অস্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হলে এই অভ্যাস আরও বেড়ে যেতে পারে।

৩. আগের ভাইরাসের সংক্রমণ

কখনো ভাইরাসের সংক্রমণ সেরে যাওয়ার পরও গলায় অস্বস্তি থেকে যেতে পারে। সংক্রমণের সময় গলায় প্রদাহ তৈরি হলে তা সেরে যাওয়ার পরও গলা কিছুদিন বেশি সংবেদনশীল থাকতে পারে।

এ ছাড়া রিফ্লাক্স বা অ্যালার্জির মতো কোনো সমস্যার কারণে প্রথমে গলা পরিষ্কার করার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। পরে মূল সমস্যা নিয়ন্ত্রণে এলেও গলার সংবেদনশীলতা ও অভ্যাসের কারণে বারবার গলা পরিষ্কার করার তাগিদ অব্যাহত থাকতে পারে।

৪. কণ্ঠস্বরের অতিরিক্ত ব্যবহার

যাঁদের দীর্ঘ সময় কথা বলতে হয়, যাঁরা গান করেন কিংবা পেশাগত কাজে নিয়মিত কণ্ঠস্বর ব্যবহার করেন, তাঁদের গলায় অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। কণ্ঠস্বরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে গলা পরিষ্কার করার তাগিদও বাড়তে পারে।

২০২৪ সালে জার্নাল অব ভয়েস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঘন ঘন কণ্ঠস্বরের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের দৈনন্দিন অভ্যাসের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ কণ্ঠনালির অস্বস্তি বাড়িয়ে সমস্যাটিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে শুধু কণ্ঠস্বরকে বিশ্রাম দেওয়াই যথেষ্ট নাও হতে পারে। বরং ব্যক্তির কাজের ধরন ও কণ্ঠস্বর ব্যবহারের অভ্যাস অনুযায়ী নিয়মিত কণ্ঠের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।

৫. গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি

কিছু মানুষের মনে হয়, গলায় কোনো পিণ্ড বা খাবারের মতো কিছু আটকে আছে। অথচ পরীক্ষা করে সেখানে কোনো বাধা পাওয়া যায় না। এ অবস্থাকে গ্লোবাস সেনসেশন বলা হয়।

রিফ্লাক্স, গলার চারপাশের পেশিতে টান কিংবা ওই অঞ্চলের সংবেদনশীলতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে এ অনুভূতির সম্পর্ক থাকতে পারে। গলায় কিছু আটকে আছে বলে মনে হওয়ায় অনেকে বারবার গলা পরিষ্কার করেন। কিন্তু তাতে অস্বস্তি সব সময় কমে না।

গলায় আটকে থাকার অনুভূতির সঙ্গে খাবার বা পানি গিলতে প্রকৃত অসুবিধা থাকলে সেটিকে শুধু গ্লোবাস সেনসেশন ভেবে উপেক্ষা করা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

বারবার গলা পরিষ্কার করলে অস্বস্তি বাড়ে কেন?

অনেকেই মনে করেন, গলা পরিষ্কার করলে সেখানে জমে থাকা শ্লেষ্মা বা অস্বস্তি দূর হবে। কিন্তু বারবার জোরে গলা খাঁকারি দিলে স্বরযন্ত্রের দুই পাশে থাকা স্বরতন্ত্রী এবং আশপাশের টিস্যুতে ঘর্ষণ ও চাপ তৈরি হতে পারে।

দিনে বহুবার এমন হলে গলার অস্বস্তি বজায় থাকতে পারে। প্রতিবার গলা পরিষ্কার করার পর টিস্যুতে সামান্য জ্বালা বা অস্বস্তি তৈরি হলে স্নায়ুতন্ত্র সেটিকে আরও বেশি অস্বস্তি হিসেবে অনুভব করতে পারে। এর ফলে আবারও গলা পরিষ্কার করার তাগিদ তৈরি হয়।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গলার স্নায়ু আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থাকে ল্যারিঞ্জিয়াল হাইপারসেনসিটিভিটি বা স্বরযন্ত্রের অতিসংবেদনশীলতা বলা হয়।

তাই বারবার গলা পরিষ্কার করার তাগিদকে নিছক মনের ভুল বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। অস্বস্তিটি বাস্তব হতে পারে। তবে এর পেছনে রিফ্লাক্স, অ্যালার্জি, সংক্রমণ-পরবর্তী সংবেদনশীলতা কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button