অন্য খবর

নির্দিষ্ট ঋতুতে বিষণ্ণতা বাড়ে কেন, যে লক্ষণগুলো খেয়াল রাখবেন

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে আবহাওয়া, দিনের আলোর পরিমাণ ও দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন আসে। এসব পরিবর্তন কারও কারও ঘুম, কর্মশক্তি ও মেজাজে প্রভাব ফেলতে পারে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কেউ যদি নিজেকে বেশি ক্লান্ত, ঘুমকাতুরে কিংবা অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পছন্দ করেন, তাহলে বিষয়টি লক্ষ করার মতো।

মাঝেমধ্যে মন খারাপ হওয়া বা কর্মশক্তি কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বারবার বিষণ্ণতার লক্ষণ দেখা দিলে তা সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (এসএডি) বা ঋতুভিত্তিক বিষণ্ণতার লক্ষণ হতে পারে।

এটি এক ধরনের বিষণ্ণতা, যার উপসর্গ সাধারণত নির্দিষ্ট ঋতুতে দেখা দেয় বা বেড়ে যায় এবং বছরের অন্য সময়ে কমে আসে। এটি কেবল ঠান্ডা আবহাওয়া কিংবা দিনের আলো কম থাকার কারণে সাময়িক মন খারাপের বিষয় নয়। উপসর্গের তীব্রতা ও স্থায়িত্বের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার কী?

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার এমন এক ধরনের বিষণ্ণতা, যা ঋতুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নির্দিষ্ট ধরন অনুসরণ করে। সাধারণত শরৎ বা শীতকালে এর লক্ষণ দেখা দেয় এবং বসন্ত বা গ্রীষ্মে তা কমে আসে। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বসন্ত বা গ্রীষ্মকালেও এ ধরনের বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে।

শীতকালীন বিষণ্ণতার সঙ্গে দিনের আলোর সংস্পর্শ কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। দিনের আলো কমে গেলে শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি, ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত কিছু জৈবিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে এই সমস্যার সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। জৈবিক বৈশিষ্ট্য, মানসিক অবস্থা ও পরিবেশগত বিভিন্ন কারণের সম্মিলিত প্রভাব এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ঋতু পরিবর্তনে মন খারাপ হওয়া কি স্বাভাবিক?

ঋতু বদলের সময় মেজাজ, কর্মশক্তি কিংবা কাজের আগ্রহে সাময়িক পরিবর্তন আসতে পারে। দিনের আলোর সময় কমে যাওয়া, দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন, অতিরিক্ত গরম কিংবা বাইরে কম সময় কাটানোর কারণে ঘুম ও অন্যান্য অভ্যাসে প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এমন পরিবর্তন হলেই কারও সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার হয়েছে, এমনটা বলা যায় না।

এ ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো উপসর্গ কতটা তীব্র, কত দিন ধরে থাকছে এবং দৈনন্দিন জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে। এই সমস্যায় সাধারণত প্রতি বছর প্রায় একই সময়ে বিষণ্ণতার লক্ষণ ফিরে আসে। কাজকর্ম, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগ ও প্রতিদিনের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে।

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারের লক্ষণ কী?

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের (এনআইএমএইচ) তথ্য অনুযায়ী, এ সমস্যার লক্ষণ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। শীতকালীন সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে:

  • দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ বা বিষণ্ণ বোধ করা
  • পছন্দের কাজ বা অন্যান্য কার্যক্রমে আগ্রহ ও আনন্দ কমে যাওয়া
  • কর্মশক্তি কমে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তি
  • স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমানো
  • মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা
  • ক্ষুধা ও খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন
  • বিশেষ করে শর্করাজাতীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া
  • অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেওয়া
  • হতাশা, অসহায়ত্ব কিংবা নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া
  • বিছানা থেকে উঠতে বা প্রতিদিনের স্বাভাবিক রুটিন বজায় রাখতে অসুবিধা হওয়া

অন্যদিকে, গ্রীষ্মকালীন সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারের লক্ষণ কিছুটা আলাদা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অনিদ্রা, ক্ষুধা কমে যাওয়া, অস্থিরতা, উদ্বেগ এবং খিটখিটে মেজাজ দেখা দিতে পারে।

দিনের আলো কমে গেলে কী প্রভাব পড়ে?

শীতকালে দিনের আলো কমে যাওয়াকে ঋতুভিত্তিক বিষণ্ণতার সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সূর্যের আলো শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এই অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা ঘুমানো ও জেগে থাকার সময় নির্ধারণে সাহায্য করে।

দিনের আলোর পরিমাণে পরিবর্তন এ ছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে। এর পাশাপাশি আলো শরীরের মেলাটোনিন ও সেরোটোনিনের মতো রাসায়নিক পদার্থের কার্যক্রমের সঙ্গেও সম্পর্কিত। মেলাটোনিন ঘুমের সময় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, সেরোটোনিন মেজাজসহ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।

দিনের আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে এসব জৈবিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে, কেন কিছু মানুষ নির্দিষ্ট ঋতুতে ঘুম, কর্মশক্তি ও মেজাজে নিয়মিত পরিবর্তন অনুভব করেন। তবে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার জটিল একটি অবস্থা। শুধু দিনের আলো কিংবা কোনো একটি জৈবিক প্রক্রিয়া দিয়ে এর সব কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না।

কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার যেকোনো ব্যক্তির হতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। যেমন:

  • আগে বিষণ্ণতা বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকলে
  • পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যার ইতিহাস থাকলে
  • এমন অঞ্চলে বসবাস করলে, যেখানে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে দিনের আলোর পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়

তবে বছরের কোনো নির্দিষ্ট সময়ে ক্লান্ত লাগা বা মন খারাপ হওয়াই এই রোগের প্রমাণ নয়। উপসর্গের ধরন, কত দিন ধরে তা থাকছে এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব বিবেচনা করে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে মূল্যায়ন করেন।

কীভাবে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার শনাক্ত করা হয়?

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার শনাক্ত করার জন্য একক কোনো পরীক্ষা নেই। চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সাধারণত রোগীর উপসর্গ, সেগুলো কখন শুরু হয় এবং প্রতি বছর নির্দিষ্ট ঋতুতে ফিরে আসে কি না, তা জানতে চান।

এ ছাড়া ঘুম, ক্ষুধা, কর্মশক্তি, আগের অসুস্থতার ইতিহাস এবং উপসর্গের কারণে দৈনন্দিন জীবনে কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, সেসব বিষয়ও মূল্যায়ন করা হয়।

একই ধরনের উপসর্গ অন্য শারীরিক বা মানসিক সমস্যার কারণেও দেখা দিতে পারে। যেমন, থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা, ঘুমের ব্যাধি, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অন্য ধরনের বিষণ্ণতায় ক্লান্তি ও মন খারাপ হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী এসব সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মন খারাপ বা ক্লান্তির প্রবণতা দেখা দিলে উপসর্গের সময়কাল ও তীব্রতা লক্ষ করা গুরুত্বপূর্ণ। আর বিষণ্ণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হলে কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়লে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button